চামড়া শিল্পনগরীর দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ সিংগাইরবাসী, দূষণে বিপর্যস্ত বংশী-ধলেশ্বরী

🕙 প্রকাশিত : ৬ আগস্ট, ২০২৬ । ৮:০৪ এএম

ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে (তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নে) অবস্থিত বিসিক চামড়া শিল্পনগরী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। কিন্তু শিল্পনগরীটি থেকে অর্থনৈতিক বা কর্মসংস্থানের কোনো প্রত্যক্ষ সুবিধা না পেলেও এর ভয়াবহ পরিবেশগত ও নদী দূষণের ক্ষতির ভার বহন করছেন পাশের মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার মানুষ। বছরের পর বছর ধরে চামড়া শিল্পনগরীর বিষাক্ত দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন শিল্প নগরীর আশপাশের এলাকাসহ সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ও জামির্ত্তা ইউনিয়নের হাজারো বাসিন্দা। একই সঙ্গে শিল্পবর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়েছে বংশী ও ধলেশ্বরী নদী, যা স্থানীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুম ও শীতকালে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দিনের বেলা কম অনুভব হলেও সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র দুর্গন্ধ। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও এ গন্ধ থেকে রেহাই মেলে না। অনেক পরিবারের সদস্যদের রাতে ঘুমানো পর্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, শ্বাসকষ্টের রোগী ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেকের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, চোখ জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি দেখা দেয়। খাবার গ্রহণের সময় দুর্গন্ধে বমি চলে আসে বলেও জানান বাসিন্দারা।

ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেকেই বলেন, বছরের পর বছর ধরে এই দুর্ভোগ সহ্য করেও তারা কোনো কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন না। বাসায় অতিথি এলে দুর্গন্ধের কারণে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। বসবাসের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্রমেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ এ দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ তাদের চোখে পড়ছে না।

শুধু দুর্গন্ধ নয়, শিল্পবর্জ্যের কারণে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বংশী ও ধলেশ্বরী নদীর পরিবেশ। স্থানীয়দের দাবি, উন্মুক্ত ডাম্পিং থেকে চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য অনবরত সরাসরি নদীতে পড়ার ফলে নদীর পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। একসময় যে নদী মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর সমৃদ্ধ আবাসস্থল ছিল, সেখানে এখন মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। জীববৈচিত্র্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নদীকেন্দ্রিক জীবিকা নির্বাহকারী অনেক জেলে মাছের সংকটে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন।

হেমায়েতপুরের বিসিক চামড়া শিল্পনগরী দেশের চামড়া খাতের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের সময় সরকারের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক মানের চামড়া শিল্প গড়ে তোলা এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা। তবে প্রায় দেড় যুগ পর এসে দেখা যাচ্ছে, সেই লক্ষ্য পূরণ তো দূরের কথা, শিল্পনগরীটি নিজেই নতুন করে পরিবেশ দূষণের অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ২০০১-২০০৬ মেয়াদে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু হয়ে ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ১৮ বছর ৬ মাস। ২০২১ সালের জুনে এর বাস্তবায়ন শেষ হয়। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা শেষ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।

ছবি: সংগৃহীত

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হয় ৯৩৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নকালে দায়িত্ব পালন করেন ১৭ জন প্রকল্প পরিচালক। এ সময়ে ৪৭টি খাতে প্রায় ৯৯৫ কোটি ৭১ লাখ ৩২ হাজার ৩৫ টাকার অডিট আপত্তিও ওঠে।
জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য ৪৭৭ কোটি ৫২ লাখ ১৭ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) প্রত্যাশিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে সরকারি সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রকাশ গণকেন্দ্র (পিজিকে)-এর সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ডাম্পিং ইয়ার্ড ও ক্রোম ব্লকের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। এতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সিইটিপি ক্ষতিকর বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন করতে সক্ষম না হওয়ায় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হয়নি। উৎপন্ন বর্জ্য-পানির পরিমাণ শোধনাগারের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হওয়ায় পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে কঠিন বর্জ্য ও স্লাজ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। আধুনিক পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় অনেক বর্জ্য খোলা জায়গায় জমা হচ্ছে। ফলে পরিবেশগত ঝুঁকি আরও বাড়ছে। প্রকল্প পরিকল্পনায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ থাকলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।

এবিষয়ে চামড়া শিল্প নগরী প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “সিইটিপির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়গুলোতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছি। সরকারও শিল্পনগরী নিয়ে আন্তরিক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় ইতালির একটি কোম্পানি বর্তমান সিইটিপি উন্নয়নে কাজ করছে। পাশাপাশি নতুন একটি সিইটিপি নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে।” তিনি আরো জানান, বর্তমানে সিইটিপি দৈনিক ১৫ হাজার ঘনমিটার পানি শোধন করতে পারে। এটি ২৫ হাজার ঘনমিটারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া সক্ষম ৩৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব সিইটিপি স্থাপনের জন্যও উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতেরও নির্দেশনা রয়েছে।

সিংগাইর উপজেলার দক্ষিণ ধল্লা (বিন্নাডাঙ্গী) এলাকার বাসিন্দা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “সাভারের হেমায়েতপুর চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্যের দুর্গন্ধে বলি নদী-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগে আছেন। দুর্গন্ধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাও যোগ হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ ও কৃষি উৎপাদনের ক্ষতি করছে। সাভারের আশপাশের বাসিন্দাদের পাশাপাশি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ও জামির্ত্তা ইউনিয়নের মানুষও এই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আমরা দ্রুত এ সমস্যার কার্যকর প্রতিকার চাই।”

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ছড়াকার, কবি, উপন্যাসিক মুহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমান বলেন, শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। তবে একটি শিল্পনগরীর কারণে যদি বছরের পর বছর হাজারো মানুষ দুর্গন্ধ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নদী দূষণের মতো দুর্ভোগের শিকার হন, তাহলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমাদের প্রত্যাশা, কার্যকর বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা চালু করে দ্রুত দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনা হবে, যাতে চামড়ার শিল্প নগরীর আশপাশের বাসিন্দাসহ সিংগাইরের দুই ইউনিয়নের মানুষ স্বাভাবিক পরিবেশে বসবাসের অধিকার ফিরে পান।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) শিল্প মালিক সংগঠনের সভাপতি মো. শাহীন আহমেদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি।
ধলেশ্বরী ও বংশী নদী রক্ষায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী বলেন, “বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের এখতিয়ারভুক্ত। আমরা একাধিকবার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে অবহিত করেছি। কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা মূলত তাদেরই রয়েছে। তবে নদী রক্ষায় সরাসরি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বিদ্যমান আইনি ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। এ কারণে কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও আইন সংশোধনের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি।”

পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ইলিয়াস মাহমুদ বলেন, চামড়া শিল্পনগরীতে নির্দেশনা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) যথাযথভাবে স্থাপন ও কার্যকর না হওয়ায় শিল্পনগরী এবং এর আশপাশের এলাকায় বর্জ্য ও বিষাক্ত দুর্গন্ধজনিত পরিবেশগত সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি জানান, সিইটিপি দ্রুত যথাযথভাবে স্থাপন ও কার্যকর করা এবং শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য ও দুর্গন্ধের কারণে যাতে পরিবেশ দূষণ না ঘটে সে বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরও বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করে যাচ্ছে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ