ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার অতি প্রাচীন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে ভারতবর্ষে প্রথম আফিম চাষ ও আফিম ব্যবসা শুরু করেছিল এবং এর জন্য একটি ফরমান জারী ও কিছু কর্মকর্তা নিয়োগ করে। বৃটিশরা ভারতবর্ষে আফিম উৎপাদন করে চীনসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে রপ্তানি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করে এবং এদেশে আফিমের দোকান চালু করে । ১৮৫৭ সনে আফিম ব্যবসাকে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন এনে প্রথম আফিম আইন প্রবর্তন এবং ১৮৭৮ সনে আফিম আইন সংশোধন করে আফিম ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। অতঃপর গাঁজা ও মদ থেকেও রাজস্ব আদায় শুরু হয় এবং ১৯০৯ সনে বেঙ্গল এক্সাইজ অ্যাক্ট ও বেঙ্গল এক্সাইজ ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। মদ ও গাঁজা ছাড়াও আফিম ও কোকেন দিয়ে তৈরী বিভিন্ন ধরনের মাদকের প্রসার ঘটলে ১৯৩০ সনে সরকার The Dangerous Drugs Act-1930 প্রণয়ন করে। একইভাবে সরকার আফিম সেবন নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৩২ সনে The Opium Smoking Act-1932 প্রণয়ন এবং ১৯৩৯ সনে The Dangerous Drugs Rules-1939 প্রণয়ন করে। ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলমানদের জন্য মদ পান নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৫০ সনে TheProhibtion Rules-1950 তৈরী হয়। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৭ সনে The Opium sales Rules-1957 প্রণীত হয়। এরপর ষাটের দশকে বেঙ্গল এক্সাইজ ডিপার্টমেন্টকে এক্সাইজ এন্ড ট্যাক্সেশন ডিপার্টমেন্ট হিসেবে নামকরণ করে অর্থমন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যস্ত করা হয়। বিশ্বে সুনির্দিষ্টভাবে মাদকের কোনো একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই, কারণ নতুন কৃত্রিম বা সিন্থেটিক মাদক নিয়মিত তৈরি হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বা কার্যকারিতার ভিত্তিতে মাদককে প্রধান ৭টি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। ২৪ ধরনের মাদক সেবন চলে বাংলাদেশে।
মাদক শুধু একজন মানুষের জীবন নষ্ট করে না বা মাদকাসক্তি শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো বিশ্বব্যাপী একটি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে আসক্ত তরুণদের বড় অংশ যে কেবল নিজেদের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি হারিয়ে জীবনের খেই হারিয়ে ফেলছে তা নয়, বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের-২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৮.৩ মিলিয়ন মানুষ তথা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৯% মাদকাসক্ত, যা আৎকে উঠার মত বিষয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৬১ লাখ গাঁজায় (প্রায় ৫২ শতাংশ), ২৩ লাখ ইয়াবায় (প্রায় ২০ শতাংশ) ও ২০ লাখ ২৪ হাজার মদ্যপানে (১৭ শতাংশ) আসক্ত। ৩ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ফেনসিডিল ও সমজাতীয় মাদকে এবং ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ হেরোইনে আসক্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, তিন লাখের মতো মানুষ ঘুমের ওষুধ মাদক হিসেবে গ্রহণ করেন। ড্যান্ডির মতো আঠাকে মাদক হিসেবে ব্যবহার করে ১ লাখ ৬০ হাজারের মতো মানুষ। শিরায় মাদক গ্রহণ করেন প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ। সব মিলিয়ে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১ কোটি ১৭ লাখের মতো। তবে একই ব্যক্তি একাধিক মাদকে আসক্ত। সেটা বিবেচনায় নিয়ে এই মাদকাসক্তের হিসাব তৈরি করা হয়েছে।
মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের পথ গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমানা), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান) এবং গোল্ডেন ওয়েজের (ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, নেপাল ও ভুটানের কিছু অংশ) কেন্দ্রে অবস্থান হওয়ায় বাংলাদেশে অবৈধ মাদকদ্রব্যের আশঙ্কাজনক বিস্তার ঘটেছে। এ ছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দেশের ৩২টি সীমান্তবর্তী জেলার অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশে প্রচলিত ও অপ্রচলিত মাদক দেশে আসছে। মাদকবিষয়ক প্রতিবেদনে দেশের চারটি অঞ্চলের ১০৪টি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের ৮ জেলার ৪৩টি, পূর্বাঞ্চলের ৪ জেলার ২১টি, উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার ২১টি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা কক্সবাজারের ১৯টি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে।
মাদকাসক্তরা বেশিরভাগ সময়ই স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে না, বেশিরভাগ সময়ই হতাশা ও হীনমন্যতায় ভোগে । স্মৃতিশক্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে, মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে এবং নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। । ফলে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। এটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি। এটি শুধু একটি আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়; এটি একই সঙ্গে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। বিশেষ করে তরুণ সমাজের একটি অংশ মাদকের ভয়াল ছোবলে জড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সমাজের স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। মাদকাসক্তির ফলে কেবল যে ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিসাধন হয় তা না, মাদকাসক্তের পরিবারের সুখ-শান্তি, সুনাম নষ্ট হয়, অনেকসময় পরিবার ভাঙ্গনেরও শিকার হয়। মাদকাসক্তদের একটি বড় অংশ বেকার থাকায় টাকা পয়সার জন্য এবং মাদকের টাকা যোগাড় করার জন্য ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মানুষের প্রাণহানিসহ বিভিন্ন অপরাধ এবং আইন-শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। ফলে মাদকাসক্তি শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, তার সঙ্গে জড়িত অসংখ্য মানুষকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশে নতুন করে চোখ রাঙাচ্ছে আমেরিকান ভয়ংকর মাদক জম্বি। সম্প্রতি সমাজিকমাধ্যমে রাজধানী ঢাকার একটি মেট্রোরেল স্টেশন, গাজীপুরের টঙ্গী ও দিনাজপুরের হিলিতে জম্বি সেবনকারীদের অদ্ভুত আচরণের ভিডিও ভাইরাল হয়। জম্বি নিয়ে জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়। এরপরই মাদকটি সম্পর্কে অধিকতর অনুসন্ধান শুরু করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। ইতোমধ্যে জম্বি পাচারে জড়িত একটি দেশীয় চক্রের সন্ধান পেয়েছে সংস্থাটি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও জম্বি মাদক পাচারকারি একটি চক্র শনাক্ত করা হয়েছে। যারা আমেরিকার টেক্সাস থেকে ভয়ংকর এ মাদক দেশে আনছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ড্রাগের মূল উপাদান হলো জাইলাজিন (Xylazine), যা মূলত পশু চিকিৎসায় (বিশেষ করে ঘোড়া বা গরু অচেতন করতে) ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী সেডেটিভ বা চেতনানাশক। এটি সেবনের পর মানুষের হাঁটাচলা ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ফিকশনাল ‘জম্বি’ বা জীবন্ত লাশের মতো দেখায় বলে বিশ্বজুড়ে এর এমন নামকরণ হয়েছে।
এ বাস্তবতায় সরকার মাদকবিরোধী কার্যক্রমে ‘জিরো টলারেন্স’ বা ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ থাকলেও সাম্প্রতিক চিত্র বলছে, সমস্যাটি আরও জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ইয়াবা,ক্রিস্টাল মেথ, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও বিভিন্ন নতুন ধরনের মাদক দেশের তরুণ সমাজের একটি অংশকে বিপজ্জনকভাবে প্রভাবিত করছে।
মাদকাসক্তির ফলে ঐতিহ্যবাহী সামাজিক মূল্যবোধসমূহ দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে যে শূন্যতা তৈরী হচ্ছে তারই সুযোগে বিদেশী সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করছে। সামাজিক মূল্যবোধসমূহ যেখানে পরিবার ও সমাজের জন্য জীবন উৎসর্গের শিক্ষা দেয়, সেখানে বিদেশী আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে পশ্চিমা বস্তুবাদী সংস্কৃতি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের নামে আত্মকেন্দ্রিক জীবনদর্শনকে অনুপ্রাণিত করে। এর ফলে তরুণরা জীবনের সবচেয়ে গঠনমূলক সময়টিতে আনন্দবিলাসের নামে স্বার্থপরের মত মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে নিজেকে, সমাজকে ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এক্ষত্রে মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শুধু শাস্তি দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের সরবরাহ বন্ধ করার পাশাপাশি এর চাহিদা কমানো, তরুণদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, পরিবারকে দায়িত্বশীল করা এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। এমতবস্থায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্র সবার সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। তরুণদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তাদের মাদকের ঝুঁকি থেকে দূরে রাখা সহজ হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার সামাজিক দায়িত্ব। মাদক নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির মূল লক্ষ্য হলো মাদকের উৎপাদন, পাচার, সরবরাহ ও অবৈধ বাণিজ্য কঠোরভাবে দমন করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, মাদকদ্রব্য জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে এই নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাদক পাচারের রুট বন্ধ করাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
মাদক পরিস্থিতির ভয়াবহতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১টি অ্যামফিটামিন-জাতীয় ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৯০.৬ শতাংশ বেশি। একই সময়ে গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও কোকেন উদ্ধারের পরিমাণ কমেছে। এই পরিসংখ্যান একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে মাদক সরবরাহের নতুন প্রবণতা ও পথের পরিবর্তনের বিষয়টিও সামনে আসে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক পাচারের ক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করেছে। মাদক ব্যবসায়ীরা এখন প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, কুরিয়ার এবং ডিজিটাল লেনদেনের মতো প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিও ব্যবহার করছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে মাদকবিরোধী কার্যক্রমেও আধুনিক প্রযুক্তি, সাইবার নজরদারি ও আর্থিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শাখার পরিসংখ্যান বলছে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা গত কয়েক বছরেও উল্লেখযোগ্য। ২০২১ সালে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় মোট ১৯ হাজার ২০৮ জন রোগীর হিসাব পাওয়া যায়। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৩১৬, ২০২৩ সালে ১৪ হাজার ৩৯৬ এবং ২০২৪ সালে ১৩ হাজার ২৪ জন। তবে ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানটি বিশেষভাবে নজরকাড়া। ওই বছরে মোট ৩৯ হাজার ৬৪১ জন রোগীর হিসাব দেখানো হয়েছে যার মধ্যে ৭ হাজার ১৫৯ জন পুরুষ ও নারী রোগীর একটি শ্রেণি এবং ৩২ হাজার ৪৮২ জন আরেক শ্রেণিতে রয়েছে। একই সরকারি পরিসংখ্যানে চিকিৎসা-পরবর্তী সুস্থ/ছাড়প্রাপ্ত ও অন্যান্য ফলাফলের হিসাবও আলাদাভাবে দেওয়া হয়েছে।
মাদক প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি নজর এবং মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তরুণদের ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত রাখতে সহায়তা করতে পারে। মাদক প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু আনুষ্ঠানিক সভা-সেমিনার নয়, বাস্তবভিত্তিক সচেতনতামূলক শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক সম্পর্ক, হতাশা মোকাবিলা, সহপাঠী এবং মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা দিতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবা ও সৃজনশীল কাজে তরুণদের সম্পৃক্ত করার সুযোগও বাড়াতে হবে।
মাদকবিরোধী লড়াইকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়ও যুক্ত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে কেবল অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। আসক্তি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা। তাই মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনঃএকীভূত করার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারকে সচেতন করতে হবে, যাতে সন্তান বা পরিবারের কোনো সদস্যের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত পেশাদার সহায়তা নেওয়া যায়। জাতিসংঘের তথ্যভান্ডারেও মাদক ব্যবহারের পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকে মাদক পরিস্থিতি মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
মাদকাসক্তিকে দূর করতে হলে প্রথমত সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে একমাত্র ইসলামী মূল্যবোধকে শক্তিশালী করেই মাদকাসক্তির মত সামাজিক ব্যাধিকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা যেতে পারে। ইসলাম যেকোন মাদকদ্রব্যকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। মাদকাসক্তির ফলে স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ব্যঘাত ঘটে তা একমুহূর্তের জন্যও অনুমোদন দিতে রাজি নয়। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন একটি মৌলিক পরিবর্তন। মাদকবিরোধী অভিযানে শুধু বাহক, ক্ষুদ্র বিক্রেতা কিংবা মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করে সাফল্য দেখালে চলবে না। ধরতে হবে মাদকচক্রের মূল হোতা, অর্থদাতা, সরবরাহকারী ও অর্থপাচারকারীদের। মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে দিতে অবৈধ সম্পদ শনাক্ত, জব্দ এবং মানি লন্ডারিংয়ের তদন্ত জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
মাদক প্রতিরোধে কঠোর আইন দরকার এবং এ আইনের কঠোর ও সৎ প্রয়োগ, কার্যকর চিকিৎসা, সামাজিক সচেতনতা,সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই মূলত দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার লড়াই। তাই এখনই সময় বিচ্ছিন্ন অভিযান থেকে বেরিয়ে একটি সমন্বিত, তথ্যনির্ভর ও মানবিক জাতীয় মাদক প্রতিরোধ কৌশল গ্রহণ করার। নইলে মাদকের বাজার যত শক্তিশালী হবে, ততই দুর্বল হবে আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনাতেও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিজিবি, কোস্টগার্ড, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কাস্টমস ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং যৌথ অভিযান আরও কার্যকর করতে হবে। স্থলসীমান্তের পাশাপাশি নদী ও সমুদ্রপথ এবং বিমানবন্দরেও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে। কারণ মাদক পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত নতুন রুট ও নতুন কৌশল গ্রহণ করছে।
সবচেয়ে বড় কথা, মাদকবিরোধী অভিযানকে কোনো সাময়িক অভিযান বা বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এটি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনার অংশ। সরকারকে নিয়মিতভাবে মাদক পরিস্থিতির পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে হবে, যাতে নীতিনির্ধারণে অনুমানের বদলে নির্ভরযোগ্য তথ্য ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র, এনজিও, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে এই লড়াইয়ের অংশীদার করতে হবে।
রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। মাদকের চোরাচালান ও অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না; তাকে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হয়।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে বাস্তবভিত্তিক প্রচারণা চালানো, অভিভাবক ও তরুণদের সচেতন করা এবং মাদকবিরোধী ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে তরুণ প্রজন্মের ওপর। তাই একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মাদক প্রতিরোধ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয় এটি আমাদের সবার সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে মাদকের অন্ধকার থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সরকারের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা অপরিহার্য। সম্মিলিত উদ্যোগ, কার্যকর আইন প্রয়োগ, মানবিক পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতার মাধ্যমে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি একটি নিরাপদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। মাদকের বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকে।









