শিরোনাম
Advertisement
মতামত

এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে অন্য এক গল্প—অভাব, অনিশ্চয়তা আর জরাজীর্ণ জীবনের গল্প

সবুজের বুকে জরাজীর্ণ কেল্লাই দক্ষিণপাড়া গ্রাম

Advertisement
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার নালী ইউনিয়নের কেল্লাই দক্ষিণপাড়া গ্রাম থেকে তোলা ছবি ।

আরও পড়ুন

নীল আকাশ আর সবুজ ধানখেত ঘেরা মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার নালী ইউনিয়নের কেল্লাই দক্ষিণপাড়া গ্রাম । গতকাল (শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর) আমি সেখানে গিয়েছিলাম । গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ । চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো হলেও এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে অন্য এক গল্প—অভাবের, অনিশ্চয়তার আর জরাজীর্ণ জীবনের গল্প ।

নীল আকাশের নিচে সবুজের বিশাল চাদর । চারপাশে গাছপালা, বাঁশঝাড় আর দিগন্তজোড়া ধানখেত । হালকা বাতাসে দুলছে ধানের শীষ । কোথাও পাখির ডাক, কোথাও গাছের পাতায় বাতাসের মৃদু শব্দ । দূর থেকে দেখলে মনে হবে, প্রকৃতি যেন আপন হাতে সাজিয়েছে শান্তির এক জনপদ ।

কিন্তু একটু গভীরে গেলেই বদলে যায় সেই ছবির অর্থ !

এই সবুজের আড়ালেই রয়েছে অভাব-অনটনে দিন কাটানো মানুষের জীবন । সেখানে রয়েছে পুরোনো টিনের ঘর, বাঁশের বেড়া, ভাঙাচোরা উঠান আর অনিশ্চিত জীবিকার গল্প ।

প্রকৃতি এখানে কার্পণ্য করেনি । উর্বর জমি, সবুজ ফসলের মাঠ, গাছের ছায়া আর নির্মল বাতাস—সবই আছে । কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রায় সেই সৌন্দর্যের প্রতিফলন খুব কম । অনেক পরিবারের ঘর এখনো টিন, বাঁশ ও মাটির ওপর দাঁড়িয়ে । কোথাও পুরোনো টিনে মরিচা, কোথাও বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় ঘরের ভেতর ।

সকাল হলেই শুরু হয় জীবনের হিসাব । কেউ কাস্তে হাতে মাঠে যান, কেউ বের হন দিনমজুরির সন্ধানে । কৃষিকাজই অনেক পরিবারের প্রধান অবলম্বন । কাজ থাকলে আয়, কাজ না থাকলে দুশ্চিন্তা । সংসারের প্রয়োজন আর আয়ের সামঞ্জস্য মেলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে প্রতিদিনই নতুন করে হিসাব করতে হয় ।

নারীরাও এই জীবন সংগ্রামের অংশ । ঘরের কাজের পাশাপাশি কৃষিকাজে সহযোগিতা করেন অনেকে । উঠানে শুকাতে দেওয়া ধান, পাশে রাখা কৃষি সরঞ্জাম আর রান্নার ধোঁয়া—সব মিলিয়ে গ্রামীণ জীবনের চেনা দৃশ্য । তবে এই স্বাভাবিকতার আড়ালে থাকে টানাপোড়েনের দীর্ঘ গল্প ।
বর্ষা এলে মেঠোপথে কাদা জমে, চলাচলে বাড়ে দুর্ভোগ । জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ মানুষকে নিয়ে যাতায়াত করতে হয় কষ্ট করে । উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধার প্রত্যাশা তাই অনেক পরিবারের দীর্ঘদিনের ।

তবে কষ্টের মধ্যেও আনন্দ আছে ।
বিকেলে মেঠোপথ ধরে স্কুল ফেরত শিশুদের দেখা যায় । মাঠে ছুটে বেড়ায় তারা । উঠানে বসে গল্প করেন বয়স্করা । কোনো বাড়িতে নতুন ধান ওঠার আনন্দ, কোথাও সন্তানের সাফল্যের হাসি । আবার কোনো ঘরে হয়তো অসুস্থ স্বজনের চিকিৎসা কিংবা সংসারের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা ।

এখানে সুখও খুব সাধারণ । বৃষ্টির রাতে ঘরের চাল দিয়ে পানি না পড়া, দিন শেষে কাজের মজুরি হাতে পাওয়া, সন্তানের মুখে হাসি দেখা কিংবা পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে খেতে পারা—এসবই বড় প্রাপ্তি ।

কেল্লাই দক্ষিণপাড়ার জীবন যেন গ্রামের সেই আঁকাবাঁকা মেঠোপথের মতো । পথটি কখনো কাদায় ডুবে যায়, কখনো ধুলায় ঢেকে যায়; আবার হঠাৎ সবুজের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে চোখ জুড়িয়ে দেয় । মানুষের জীবনও তেমন—কষ্টের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলা, আর ছোট ছোট আনন্দে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা ।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের পাশে মানুষের এই জরাজীর্ণ জীবন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে । ধানের শীষ এখানে দোলে, পাখি গান গায়, বাতাস বয়ে যায়; অথচ অনেক ঘরের ভেতর এখনো জমে থাকে অভাবের দীর্ঘশ্বাস ।

তবু তারা স্বপ্ন দেখে । একদিন হয়তো মেঠোপথটি পাকা হবে। ঘরগুলো হবে নিরাপদ । কাজের সুযোগ বাড়বে । সন্তানদের ভবিষ্যৎ হবে একটু নিশ্চিন্ত । সেই আশাতেই প্রতিদিন নতুন সকাল শুরু করেন কেল্লাই দক্ষিণপাড়ার মানুষ ।

সবুজের বুকের এই গ্রাম তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি—যেখানে প্রকৃতি অপরূপ, জীবন কঠিন, কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকু এখনো অমলিন ।

এ বিভাগের আরও সংবাদ