১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত দলটি এ বছর ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে। কিন্তু ২০২৬ সালের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আবহ অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় আলাদা। কারণ, দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে তাঁর মৃত্যুর পর এটাই বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সাধারণত একটি রাজনৈতিক দলের জন্য আনন্দ, গৌরব, সাফল্যের মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণের উপলক্ষ। কিন্তু এবার সেই আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গভীর শোক ও স্মৃতির আবেগ। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং দীর্ঘ সময়ের নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতিকে সামনে রেখে বিএনপির নেতাকর্মীরা এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করবেন। তাই এবারের ১ সেপ্টেম্বর একই সঙ্গে ইতিহাসের স্মরণ, শোকের প্রকাশ এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর দিন।
যেহেতু বর্তমানে বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট চলছে তাই এই দিনে দলীয় কার্যালয় ও অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা না করে প্রতীকীভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যেতে পারে। একই সঙ্গে জনগণকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানো যেতে পারে।
এতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা যাবে—“যে সংকটে মানুষ ভুগছে, বিএনপি সেই সংকটকে রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয়ই শুধু নয়, নিজেদের কর্মসূচিরও বিষয় করেছে।” বর্তমান বাস্তবতায় ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বড় জমায়েত, মিছিল বা ব্যয়বহুল আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে জনদুর্ভোগের পাশে দাঁড়ানোর দিন হিসেবে তুলে ধরা হলে তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষের কাছে তা বেশি গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস ছিল নানা পরিবর্তন, সংকট ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে পূর্ণ। সেই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ( বিএনপি ) প্রতিষ্ঠা করেন স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বিএনপির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে বিশেষভাবে যুক্ত করা হয়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনা, সংসদীয় রাজনীতি, বিরোধী দলের আন্দোলন এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিএনপির অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
বিএনপির রাজনৈতিক বিকাশে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর নেতৃত্বে দলটি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি একাধিকবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে স্থান করে নেন।
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপি’র প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা শোকে মুহ্যমান। তাই ২০২৬ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু দলের ৪৮ বছরের পথচলার উদ্যাপন নয়; এটি খালেদা জিয়াকে ছাড়া দলের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘদিন দলের নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। ফলে তাঁর অনুপস্থিতি এবারের অনুষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবেই একটি শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করবে। একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু কেবল তাঁর পরিবার বা অনুসারীদের জন্য ব্যক্তিগত বেদনা সৃষ্টি করে না; দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কারণে তা একটি দলের সাংগঠনিক ও ঐতিহাসিক স্মৃতিতেও প্রভাব ফেলে। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি বিএনপির নেতৃত্বে বহু বছর ছিলেন এবং দলের রাজনৈতিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এ কারণে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে আনন্দের চেয়ে স্মৃতির আবেগ ও শোকের মাত্রা বেশি দৃশ্যমান হওয়াই স্বাভাবিক।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম সরাসরি যুক্ত। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর স্মৃতি প্রতিটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে ফিরে আসে।অন্যদিকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বিএনপি’র দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিএনপির উত্থান, আন্দোলন, নির্বাচন, সরকার পরিচালনা এবং বিরোধী রাজনীতির বিভিন্ন অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। তাই এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্মৃতি পাশাপাশি উপস্থিত থাকবে। বিএনপি ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে, ১ সেপ্টেম্বর সকালে দলীয় নেতারা জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা ও দোয়া করবেন।এই কর্মসূচির প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এতে দলের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং সাম্প্রতিক শোক—দুইটি বিষয় একই সঙ্গে প্রতিফলিত হয়।
রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সাধারণত সংগঠনের শক্তি প্রদর্শন, কর্মীদের উজ্জীবিত করা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি তুলে ধরার একটি উপলক্ষ। কিন্তু শোকের পরিস্থিতিতে সেই উদ্যাপনের ভাষা স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত হয়।এবার বিএনপির জন্য প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে—অতীতকে স্মরণ করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া। একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস শুধু তার অর্জনের ইতিহাস নয়; এটি সংকট, ভুল, সাফল্য, ব্যর্থতা, আন্দোলন এবং পরিবর্তনেরও ইতিহাস। ৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থেকেছে, বিরোধী দলে থেকেছে এবং নানা রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলের জন্য আত্মসমালোচনা ও আত্মমূল্যায়নেরও একটি সুযোগ।
বিএনপি ২০২৬ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ১ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়গুলোতে পতাকা উত্তোলন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং পরবর্তী দিনগুলোতে আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে। বৃক্ষরোপণ ও মাছ অবমুক্তকরণের কর্মসূচিও রয়েছে। এছাড়াও ৫ সেপ্টেম্বর ‘বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভা করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আলোচনা করার একটি আনুষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি হবে।এই কর্মসূচিগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলো বৃক্ষরোপণ ও মাছ অবমুক্তকরণ। কারণ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেবল রাজনৈতিক সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক ও পরিবেশগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্রবণতা এখানে দেখা যায়।
কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য একজন দীর্ঘদিনের নেতার অনুপস্থিতি একটি বড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, সাংগঠনিক ঐক্য, নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা—এসব বিষয় তখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই অর্থে ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একটি ‘ট্রানজিশন’ বা পরিবর্তনের মুহূর্তও হতে পারে। অতীতের নেতৃত্ব ও ঐতিহ্যকে সম্মান করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দলের রাজনৈতিক বক্তব্য কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু একটি দলের সাংগঠনিক অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও ভাবার একটি সুযোগ। একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেন সহিংসতা, প্রতিহিংসা বা অসহিষ্ণুতায় পরিণত না হয়—এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল শুধু নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে শক্তিশালী হয় না; নীতি, সংগঠন, জনসম্পৃক্ততা, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক আচরণের মাধ্যমেও তার শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। তাদের কাছে রাজনৈতিক দলের ইতিহাসের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি, পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলো তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে। তাই বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ করার দিন হলে চলবে না; ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে দলটির পরিকল্পনা কী—সেটিও জনগণের সামনে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
সবশেষে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং বিএনপির আগামী দিনগুলো যেন সুন্দর ও সমৃদ্ধ হয় সেই কামনা করছি। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এটি একই সঙ্গে উৎসব ও শোকের দিন। পতাকা উঠবে, আলোচনা হবে, নেতাকর্মীরা সমবেত হবেন; কিন্তু সেই আনুষ্ঠানিকতার মাঝেও থাকবে একজন প্রিয় নেত্রীর অনুপস্থিতির বেদনা।রাজনৈতিক সংগঠনের ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শোক কখনো কখনো একটি সংগঠনকে তার অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। কী অর্জিত হয়েছে, কী হারানো হয়েছে এবং সামনে কী করতে হবে—এসব প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে।বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই দলের কাছে একটি আবেগঘন স্মৃতির দিন হওয়ার পাশাপাশি সাংগঠনিক আত্মমূল্যায়নেরও দিন এবং শোককে শক্তিতে পরিণত করার অঙ্গীকার।
(লেখক: প্রকৌশলী মোঃ জাকির হোসেন, পিইঞ্জ। ফেলো, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন,বাংলাদেশ ও যুগ্ম আহ্বায়ক, জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটি।)

