বিগত আওয়ামী লীগের আমলে রাজনৈতিক উত্তাল ও অত্যন্ত প্রতিকূল দিনগুলোতে যেখানে সংগঠন চালানো ছিল কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ, ঠিক তখন নিজের মেধা, কৌশল ও অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে এক সময়ের ছন্নছাড়া ছাত্রদলকে ঐক্যবদ্ধ ও পুনর্গঠিত করে রেখেছিলেন এক তরুণ ছাত্রনেতা রাজা আহমেদ মিন্টু। আগারগাঁও, ৬০ ফিট, শ্যামলী ও শেরেবাংলা নগর এলাকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ছাত্রদলকে নিজের মেধা ও পরিশ্রমের জোরে এক ছাতার নিচে গুছিয়ে রাখেন তিনি। বর্তমানে তিনি শেরেবাংলা নগর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজা আহমেদ মিন্টুর রাজনৈতিক ও সুশৃঙ্খল জীবনের সূচনা ২০০৮ সালে, যখন তিনি মোহাম্মদপুর গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন। সেসময় তিনি বিএনসিসি (BNCC)-এর একজন দক্ষ ক্যাডেট হিসেবে সাভার ক্যান্টনমেন্ট থেকে কঠোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব সততার সাথে পালন করেন। রাজনীতির পাশাপাশি স্কাউটিং ও বিএনসিসির প্রশিক্ষণ তাঁর সংগঠক হয়ে ওঠার পথকে সুদৃঢ় করে। তৃণমূল থেকে ধাপে ধাপে উঠে এসে তিনি কাজী অফিস ইউনিট ছাত্রদলের সভাপতি, ৪১ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, ওয়ার্ড বিএনপির সহ-ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক এবং ২০১৭ সালে ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দেন।
বিগত সরকারের আমলে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের নির্মম স্মৃতির কথা উল্লেখ করে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মিন্টু বলেন, “বিগত ১৭টা বছর সংগঠনের জন্য সাধারণ কর্মীরা যে কী পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করেছে, তা মুখে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেছি—গ্রেপ্তার এড়াতে কত রাত হাসপাতালের ছাদ, ফুট ওভারব্রিজে ছদ্মবেশে বা বাস কাউন্টারে যাত্রী সেজে কাটাতে হয়েছে, আর্থিক ভাবে আমাকে এত বেশি পঙ্গু করা হয়েছিল যে, পালাতক অবস্থায় দিন রাত না খেয়েও পার হয়েছে। আমার ছোট একটা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান চোখের পলকে দখল করে নিল, ধ্বংস করে দিল আমার আর্থিক মেরুদন্ড।”
রাজনীতিতে শৃঙ্খলা ও সততা বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, “যাঁরা হৃদয়ে দল ও জিয়ার আদর্শকে ধারণ করেন, বেগম খালেদা জিয়ার ত্যাগকে শ্রদ্ধা করেন এবং তারেক রহমানের নির্দেশনায় আস্থা রাখেন—তারা কখনো রাজনীতিকে পুঁজি বানিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বা লাভের চিন্তা করতে পারেন না। ”
কেবল রাজপথের আন্দোলনেই নয়, মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছেন মিন্টু। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে এবং ৫ই আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তিনি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি আহত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসায় সার্বিক সহায়তা দেন। বিশেষ করে পঙ্গু হাসপাতালে একটি দালাল চক্রের সিন্ডিকেট যখন আহতদের পরিবারকে জিম্মি করার চেষ্টা করে, তখন মিন্টুর নেতৃত্বে সেই সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়। এর পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা সংকটের দিনে রাত জেগে নিজ এলাকায় ডাকাতি প্রতিরোধে পাহারা দেন তাঁর অনুসারীরা।
সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় দলীয় প্রধানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মিন্টু ও তাঁর বন্ধুরা কোনো অনুদান ছাড়াই নিজেদের জমানো টাকা ও বেতনের অর্থ দিয়ে এক তহবিল গঠন করেন। সেই অর্থে নোয়াখালীর মাইজদীতে প্রায় ৮০০ বানভাসি পরিবারের মাঝে সরাসরি ত্রাণ বিতরণ করেন তাঁরা। এছাড়া পবিত্র রমজান মাসে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক সামলানোর পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’-এর নাম ও লোগো সম্বলিত বোতলে বিশুদ্ধ পানি ও ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হয়, যা শেরেবাংলা নগর এলাকায় বিএনপি ও ছাত্রদলের ভাবমূর্তি বহুগুণ উজ্জ্বল করেছে। পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা সামগ্রী ও পানি বিতরণ এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে এলাকায় এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন তিনি।
তবে দেড় দশকের রক্ত, ঘাম ও রাজপথের নিরবচ্ছিন্ন ত্যাগের পর কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক মূল্যায়নের প্রশ্ন উঠতেই এই লড়াকু নেতার কণ্ঠে ঝরে পড়ে গভীর অভিমান। নিজের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ও ভেতরের আকুতি ব্যক্ত করে মিন্টু বলেন, ” দুসময়ে নিজের সর্বস্ব বাজি রেখে সংগঠন গুছিয়েছি। আগস্ট-পরবর্তী নতুন রাজনীতিতে যাঁরা নেতৃত্বের যোগ্যতার বিচার করবেন, তাঁরা যদি রাজপথের রক্ত ও ঘামের মূল্য না দেন—তবে তৃণমূলের প্রকৃত সংগ্রমী কর্মীরা কখনো বিদ্রোহ বা সংগঠনের ক্ষতি করবে না, বরং সমস্ত অভিমান বুকেই চেপে রেখে নীরবে পিছিয়ে যাবো।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও তৃণমূল কর্মীদের মতে, রাজা আহমেদ মিন্টুর এই অভিমানে ভরা কিন্তু অত্যন্ত আনুগত্যপূর্ণ বার্তাটি স্রেফ কোনো ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়; বরং দীর্ঘকাল রাজপথে নির্যাতিত ও অবমূল্যায়িত তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভেতরের জমে থাকা নীরব কষ্টের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।





