বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আলোচিত নাম। গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, জাতীয়তাবাদ এবং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তিনি না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন। তাঁর প্রয়ানের পর প্রথমবারের মতো দেশের মানুষ তাকে অশ্রুসিক্ত নয়নে স্মরণ করছে। ১৫ আগস্ট ২০২৬ তাঁর ৮২তম জন্মদিনে তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল এক সংকটময় সময়ে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর জন্মদিন স্মরণের দিন নয়; তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা মূল্যায়নেরও একটি উপলক্ষ। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দীর্ঘদিন দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।তিনি সবসময় ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতেন। তিনি মনে করতেন ‘রাজনৈতিক দলের শক্তি শুধু মিছিল, সভা কিংবা নির্বাচনী সাফল্যের মধ্যে নয়; জনগণের আস্থা অর্জন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্যেই একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি নিহিত।’
বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল থাকতেন সেভাবে সকলের উচিত গণতন্ত্রের প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা রাখা। মতের পার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। তাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সম্মান করা, ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার রক্ষা করা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিশ্বাস রাখা জরুরি।
বেগম খালেদা জিয়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। দলীয় পরিচয় কোনো অপরাধ বা অন্যায়ের ঢাল হতে পারে না। তাই বিএনপির কোনো নেতাকর্মী অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মানসিকতা থাকতে হবে। একইভাবে বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ অনুকরণ করে সকলকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, হয়রানি ও প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার অঙ্গীকার করতে হবে। তবে এই সমাজ হবে শান্তিময়।
বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন জনসমাবেশে সব সময় বলতেন, ‘জনগণের সেবা করা আমার রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্য।’ সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক দলের কাছে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং উন্নত জীবন প্রত্যাশা করে। তাই বেগম খালেদা জিয়ার অনুসারীদের মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হবে রাজনৈতিক আদর্শের বাস্তব প্রয়োগ।
বেগম খালেদা জিয়া তার জীবদ্দশায় সব সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের সম্পদ মনে করতেন। তাই কোনো নেতাকর্মী যেন ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তুলতে না পারে, সে বিষয়ে দলীয়ভাবে ক্ষমতাসীন দলের কঠোর নৈতিক অবস্থান থাকা প্রয়োজন। ক্ষমতাসীন দলকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সততাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি করতে হবে।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সহিংসতার রাজনীতি পরিহার করে পরিচ্ছন্ন ভাবে রাজনীতি করতেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তা কখনো মানুষের জানমাল, ব্যবসা-বাণিজ্য বা নাগরিক জীবনের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করতে পারে না। রাজনৈতিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আইনসম্মত হওয়া উচিত।
বেগম খালেদা জিয়া দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সবসময় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং যোগ্যতা, সততা ও জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে নেতৃত্ব তৈরি করতেন। তাই সবাই যদি ব্যক্তিপূজা না করে, নীতি ও আদর্শকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু মনে করে তবেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্র অনেক সুন্দর ও সাবলীল হবে।
বেগম খালেদা জিয়া সব সময় তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই প্রযুক্তিনির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক ও উৎপাদনশীল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
বেগম খালেদা জিয়া নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার জন্য বিভিন্ন রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। একজন নারী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই তাঁর জন্মবার্ষিকীতে নারীর প্রতি সম্মান, নিরাপত্তা ও সমঅধিকারের প্রতিশ্রুতি আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।
বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্য রক্ষা করার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। তিনি মনে করতেন বাংলাদেশ কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নয়; এটি সব নাগরিকের দেশ। তাই আমাদের সকলকে ধর্ম, মত, রাজনৈতিক পরিচয়, অঞ্চল কিংবা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য ভুলে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতাকে অধিকার নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে আসে এবং জনগণের কাছেই জবাবদিহি করতে হয়। তাই বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাদর্শ ধারণ করে সকলকে ক্ষমতায় থাকলে অহংকার নয়, বিনয়; বিরোধী অবস্থানে থাকলে প্রতিহিংসা নয়, গঠনমূলক সমালোচনা—এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সুতরাং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকীতে সকলের অঙ্গীকার হতে পারে—দেশের প্রতি আনুগত্য, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা, আইনের শাসনের প্রতি বিশ্বাস, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সর্বোপরি মানুষের কল্যাণে কাজ করা। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে একটি জন্মবার্ষিকী শুধু স্মরণানুষ্ঠান হয়ে থাকবে না; বরং তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
শুভ জন্মদিন প্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আপনার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও দোয়া।
লেখক: ফেলো, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ।

