ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুল জ্বালানি নীতির খেসারত: গভীর সংকটে বাংলাদেশের গ্যাস খাত

🕙 প্রকাশিত : ১৩ আগস্ট, ২০২৬ । ২:৪৬ পিএম

ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ও অপরিকল্পিত জ্বালানি ব্যবস্থাপনার বোঝা আজ চেপে বসেছে দেশের গ্যাস খাতে ; যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প ,বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের জীবনে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, পরিবহন এবং নগরায়ণের প্রধান জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। দেশের অধিকাংশ গ্যাসক্ষেত্র স্থলভাগে অবস্থিত। কিন্তু গত দুই দশকে এসব ক্ষেত্রের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করায় নতুন গ্যাসের উৎস অনুসন্ধান অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে।
এমন প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের বহু দেশে সমুদ্রের তলদেশ থেকে জ্বালানি উত্তোলনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। নরওয়ে, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া এবং ব্রাজিল তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আশা করা হয়েছিল যে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান ত্বরান্বিত হবে এবং একসময় বড় আকারের গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হতে পারে। যদিও এই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও এটি ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র।
২০১২ সালের সমুদ্রসীমা রায় বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্তের সূচনা করে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধে ছিল। এই বিরোধের কারণে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগে অনাগ্রহী ছিল। কারণ বিরোধপূর্ণ এলাকায় অনুসন্ধান ও বিনিয়োগে আইনি ঝুঁকি থাকে।
২০১২ সালে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনাল (ITLOS) বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি করে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে স্থায়ী সালিশি আদালতের (PCA) রায়ে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমাও চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়।এই দুই রায়ের ফলে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি সমুদ্রাঞ্চলের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি : ২০১২ সালে বাংলাদেশে কোনো বড় বাণিজ্যিক অফশোর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি। বরং ওই সময় সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ফলে অনুসন্ধানের আইনি ও কৌশলগত পথ উন্মুক্ত হয়েছিল। এই পার্থক্যটি ইতিহাসের নির্ভুলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গোপসাগর পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অববাহিকা। কোটি কোটি বছর ধরে নদীবাহিত পলির স্তর জমে এখানে এমন ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা তেল ও গ্যাস সঞ্চয়ের জন্য অনুকূল বলে বিবেচিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। তরল হাইড্রোকার্বনেরও সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভবিষ্যতে গ্যাস হাইড্রেটের মতো বিকল্প জ্বালানির সম্ভাবনাও থাকতে পারে। তবে সম্ভাবনা এবং আবিষ্কার এক বিষয় নয়। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রত্যাশা সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর দেশের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকে ধারণা করেছিলেন যে কয়েক বছরের মধ্যেই আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু করবে। বাংলাদেশে যদি বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হতো তাহলে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় হ্রাস, শিল্পায়নে গতি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়,কর্মসংস্থান বৃদ্ধি , রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবে এই অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।

ভারত ও মিয়ানমারের ভিন্ন বাস্তবতা বাংলাদেশ যখন নতুন করে অনুসন্ধানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ভারত ইতোমধ্যে পূর্ব উপকূলের কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকাসহ একাধিক অফশোর গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। একইভাবে মিয়ানমারও ইয়াদানা, ইয়েতাগুন, শ্বে এবং পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি অফশোর গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস উৎপাদন ও রপ্তানি শুরু করে। ফলে ভারত ও মিয়ানমার শুধু নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তাই শক্তিশালী করেনি বরং গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করেছে।

আওয়ামীলীগ যতদিন ক্ষমতায় ছিল বাংলাদেশের অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম , বিভিন্ন সরকারের নীতিমালা, আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানির ভূমিকা এবং গ্যাস অনুসন্ধান প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। সাগর ও স্থলে গ্যাস অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত করে পেট্রোবাংলা কে এলএনজি আমদানির উপর নির্ভরশীল করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করার জন্য পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকার দায়ী। এছাড়াও শাহানেওয়াজ পারভেজ নামক এক কর্মকর্তার কথা শোনা যায় যিনি ২০১৪ সালে বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দুটি ব্লক ss-4 ও ss-9 ভারতীয় কোম্পানি ONGC কে এককভাবে প্রদান করে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করেছিল। এছাড়াও পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা বিভাগ গভীর সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের কার্যকরী কোন পরিকল্পনা নিতে ২০১২ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। এ সময়ে পেট্রোবাংলার একজন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক আইয়ুব খান চৌধুরীকে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর সময় পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আইয়ুব খান চৌধুরীর চাকরির মেয়াদ শেষ হলে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার মোঃ আব্দুল মান্নান পাটোয়ারী কে পরিচালক (পরিকল্পনা) পদে নিয়োগ দেন। তিনি হিসাববিজ্ঞান বিভাগের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তাকে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) পদের মতো একটি কারিগরি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। কোন এক অদৃশ্য কারণে তিনি এখনো সেই পদে বহাল আছেন।

সবশেষে ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শেষ করবো। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করা হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ১২টি আন্তর্জাতিক কোম্পানি টেন্ডার সিডিউল কিনেছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কোন কোম্পানি পরবর্তীতে দরপত্র দাখিল করেনি। এই বিষয়টিরও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান সরকারের সময়ে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এবারের প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছতা এবং সফলতার সঙ্গে শেষ হয় সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে। এছাড়া দেশের স্বার্থ পরিপূর্ণভাবে বজায় রেখে বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনে অভিজ্ঞ অন্য কোন দেশের সঙ্গে দ্রুততার সঙ্গে জি টু জি চুক্তি করা যায় কিনা সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

( লেখক: ফেলো, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ এবং যুগ্ম আহ্বায়ক, জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটি।)

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ