শিরোনাম
Advertisement
সম্পাদকীয়

যুদ্ধ-সংঘাতের অভিঘাতে বিশ্ব, বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি

Advertisement
সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক টেলিগ্রাম

আরও পড়ুন

সমগ্র বিশ্ব যেন আজ যুদ্ধ ও সংঘাতের উত্তাপে অস্থির। এক প্রান্তে সশস্ত্র সংঘাত, অন্য প্রান্তে রাজনৈতিক অস্থিরতা; কোথাও জ্বালানি সংকট, কোথাও মূল্যস্ফীতি, আবার কোথাও কর্মসংস্থানের সংকোচন—সব মিলিয়ে পৃথিবী যেন এক অদৃশ্য অস্থিরতার বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

বিশ্বায়নের এই যুগে পৃথিবীর এক প্রান্তে সংঘাতের দামামা বাজলে তার অভিঘাত আর সেই ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্য, জ্বালানি, বাণিজ্য, পরিবহন ও অর্থনীতির মাধ্যমে সেই প্রভাব বহু দূরের দেশেও পৌঁছে যায়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংঘাত ও অস্থিতিশীলতায় আক্রান্ত অর্থনীতিগুলোতে মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের পরিস্থিতি অন্যান্য উন্নয়নশীল অর্থনীতির তুলনায় দ্রুত অবনতি ঘটে।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক অভিঘাতের বাইরে নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে, যা একটি সুস্থ ও শৃঙ্খলিত সমাজের জন্য উদ্বেগের। থানার ভেতরে সংঘর্ষ, আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, হাসপাতাল-ক্লিনিকে হামলা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট, রাস্তাঘাটে নিরাপত্তাহীনতা ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য—সব মিলিয়ে জনমনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও সমাজের চলমান অস্থিরতাকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখা শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ।

বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অভিঘাত যে এই অস্থিরতার পেছনে ভূমিকা রাখছে, তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য ও সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বলেছে, যুদ্ধজনিত জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, দুর্বল বিনিয়োগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অভিঘাত মোকাবিলাকে অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে এবং পারিবারিক চাপ বাড়তে পারে। এর পাশাপাশি সামাজিক ধৈর্যও ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে তুচ্ছ ঘটনাও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেখানে অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং নাগরিকদের আস্থার পরিবেশ একসঙ্গে নিশ্চিত করা যায়।

উন্নত দেশগুলো সংকট মোকাবিলায় কেবল আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে না; সংকটের অভিঘাত থেকে নাগরিকদের সুরক্ষাকেও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির মতো সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।

এই অস্থিরতা কীভাবে শেষ হবে, তার উত্তর একদিনে মিলবে না। বৈশ্বিক যুদ্ধ ও সংঘাত থেমে গেলেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব দীর্ঘদিন থাকতে পারে। তাই কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি প্রয়োজন বিচক্ষণ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। সর্বোপরি প্রয়োজন ধৈর্য ও পারস্পরিক সহনশীলতা।

সংকট যত গভীরই হোক, মানুষের মনে যদি নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা ফিরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে অস্থিরতার এই সময়ও অতিক্রম করা সম্ভব। শুধু পুলিশ বাড়ানো কিংবা অভিযান পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদে একটি অস্থির সমাজকে স্থিতিশীল রাখা যায় না। প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেখানে নাগরিকদের আস্থা ও নিরাপত্তার পরিবেশ নিশ্চিত হয়।

একটি ভীতিমুক্ত ও স্থিতিশীল সমাজ শুধু অর্থনীতিকে সচল রাখে না, মানুষের সামাজিক ও মানসিক স্বস্তিও নিশ্চিত করে। বর্তমান বিশ্বে সেই স্থিতিশীলতা ও শান্তির প্রয়োজনই সবচেয়ে বেশি।

এ বিভাগের আরও সংবাদ