জলবায়ু পরিবর্তনে দীর্ঘ হচ্ছে ডেঙ্গুর মৌসুম, মশার উৎস ধ্বংসেই কার্যকর প্রতিরোধ

শহিদুল ইসলাম সুজনসম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক টেলিগ্রাম
🕙 প্রকাশিত : ৬ আগস্ট, ২০২৬ । ৫:৪১ এএম

থেমে থেমে বৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে সতর্ক করেছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কেবল ওষুধ ছিটিয়ে নয়, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা জানান, চলতি বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ডেঙ্গু সংক্রমণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। অতিবৃষ্টিতে প্রজননস্থল ধুয়ে গেলেও থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিতে বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, এসির ট্রে, প্লাস্টিকের ড্রাম এবং নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে দ্রুত এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কবিরুল বাসার বলেন, অনেকেই মনে করেন একবার ডেঙ্গু হলে দ্বিতীয়বার আর হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। কিন্তু বাস্তবে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ভিন্ন সেরোটাইপ রয়েছে। একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সেরোটাইপে পুনরায় সংক্রমিত হলে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডিইএন-২ সেরোটাইপের প্রাধান্য ছিল প্রায় ৭০ দশমিক ২ শতাংশ। সেরোটাইপের এই পরিবর্তন ওই বছরের ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো রোগীকে দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া। অনেকেই জ্বর কমে যাওয়াকে সুস্থতার লক্ষণ মনে করলেও এ সময়ই শুরু হতে পারে রোগের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’। এ পর্যায়ে শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ এবং বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট অথবা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে ১৯৬৫ সালে প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হলেও ২০০০ সালে রোগটি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর কয়েক দফায় বড় প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন এবং মারা যান ১৭৯ জন। তবে ২০২৩ সাল ছিল দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ, যখন ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং প্রাণ হারান ১ হাজার ৭০৫ জন।

২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরের আক্রান্তের সংখ্যা রাজধানীর তুলনায় বেশি ছিল। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে ডেঙ্গু এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক রোগ নয়, গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বুধবার (৫ আগস্ট) পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৯৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪০৯ জনে। এ পর্যন্ত ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ২৮১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কক্সবাজারেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে; সেখানে এ পর্যন্ত ৫৭২ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গুর মৌসুমও বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে জুলাই-আগস্ট ছিল সংক্রমণের প্রধান সময়, এখন সেপ্টেম্বর-অক্টোবর এমনকি নভেম্বর-ডিসেম্বরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এর পেছনে বৃষ্টিপাতের ধরণ পরিবর্তন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ভারতের কলকাতার অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা। সেখানে ফগার মেশিনের ওপর নির্ভর না করে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের কৌশল গ্রহণের ফলে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

অধ্যাপক কবিরুল বাসার বলেন, বাসাবাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, এসির ট্রে কিংবা প্লাস্টিকের ড্রামে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদের সম্পৃক্ত করে সম্মিলিতভাবে মশার উৎস ধ্বংসে কাজ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধু মশক নিধন কর্মসূচি বা ওষুধ ছিটানোর ওপর নির্ভর করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ এবং নিয়মিতভাবে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ