শিরোনাম
Advertisement
জলবায়ু

শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কা, ২০২৭ সালে নতুন উষ্ণতার রেকর্ডের শঙ্কা

Advertisement
ছবি: সংগৃহীত

আরও পড়ুন

প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। এর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, দাবানল, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনো আগামী কয়েক মাসে আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এল নিনো ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে এটি আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত এল নিনো স্থায়ী থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা গড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এর প্রভাব শুধু সমুদ্রের তাপমাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবী এমনিতেই ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনোর অতিরিক্ত উষ্ণতা যুক্ত হলে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। ফলে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক উষ্ণতার নতুন রেকর্ড তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কীভাবে প্রভাব ফেলে এল নিনো

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্র অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠলে বায়ুমণ্ডলের বৃহৎ অংশের চলাচলে পরিবর্তন আসে। এর ফলে কোনো অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে, আবার অন্য কোথাও দেখা দিতে পারে খরা।

কোনো কোনো এলাকায় তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে, আবার অন্য অঞ্চলে হতে পারে অতিবৃষ্টি ও বন্যা। ফলে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব বিশ্বের সব অঞ্চলে একই রকম হয় না।

এ কারণে এল নিনোকে শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর প্রভাবে বন্যা, খরা ও চরম তাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর ২০২৬ সময়ে বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনা রয়েছে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।

বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে পারে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি

এল নিনোর প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় দেখা দিতে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ভারতে মৌসুমি বৃষ্টির ধরন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতেও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার কিছু এলাকায় অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ একই সময়ে বিশ্বের এক প্রান্তে মানুষ খরার কারণে পানির সংকটে পড়তে পারে, আবার অন্য প্রান্তে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হতে পারে।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় বড় চাপের আশঙ্কা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন চাপে রয়েছে। তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। শক্তিশালী এল নিনো এই সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি আশঙ্কা করছে, এল নিনোর প্রভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকট বা ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। চরম আবহাওয়া শুধু কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করবে না, সরবরাহব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। কারণ এসব পরিবারের আয়ের বড় একটি অংশ খাদ্য কিনতেই ব্যয় হয়। খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যের এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ক্রিস জ্যাকারিনি সতর্ক করে বলেছেন, একের পর এক তাপপ্রবাহ ও ব্যাপক খরার কারণে ব্রিটিশ কৃষকরা ২০২৬ সালে বড় ধরনের ফসল বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতের কঠিন বছরগুলোর তুলনায় বর্তমান সময়কেই তুলনামূলক ভালো সময় মনে হতে পারে।

‘এক হাজার বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী’ দাবিতে সতর্কতা

এবারের এল নিনোর সম্ভাব্য শক্তি বোঝাতে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এটিকে অত্যন্ত শক্তিশালী বা ‘গডজিলা-স্তরের’ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করছেন। তবে ‘এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী’—এমন বক্তব্যকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

কারণ গত এক হাজার বছরের সরাসরি সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিমাপ মানুষের হাতে নেই। অতীতের এল নিনোর মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পেতে বিজ্ঞানীরা প্রবালের রাসায়নিক গঠন, গাছের বলয় ও ঐতিহাসিক নথিসহ বিভিন্ন প্রক্সি তথ্য ব্যবহার করেন।

তাই এটিকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত রেকর্ড না বলে বৈজ্ঞানিক পুনর্গঠন ও বর্তমান মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস থেকে পাওয়া একটি আশঙ্কা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত। তবে এল নিনোর বর্তমান পরিস্থিতি যে ব্যতিক্রমী এবং আগামী মাসগুলোতে এটি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সে বিষয়ে পূর্বাভাসে জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্যও সতর্কতার বার্তা

এল নিনোর কারণে বাংলাদেশে সরাসরি কত ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়বে—এভাবে নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। কারণ একটি দেশের আবহাওয়ার ওপর এল নিনোর প্রভাব নির্ভর করে মৌসুম, ভারত মহাসাগরের অবস্থা, আটলান্টিকের তাপমাত্রাসহ আরও বিভিন্ন জলবায়ু নিয়ামকের ওপর।

তবে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এর সম্ভাব্য পরোক্ষ প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে আমদানিনির্ভর বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা কিংবা অতিবৃষ্টির মতো ঝুঁকিও নজরে রাখতে হবে।

ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের দূরবর্তী অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি বাংলাদেশের জন্যও পুরোপুরি দূরের কোনো ঘটনা নয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের এল নিনোর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে। ফলে প্রশ্ন শুধু ২০২৬ সালের শেষ দিকে কতটা গরম পড়বে, তা নয়; বরং আরও উষ্ণ পৃথিবীতে শক্তিশালী এল নিনোর অভিঘাত মোকাবিলায় বিশ্ব কতটা প্রস্তুত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশান্ত মহাসাগরের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠছে এবং আগামী কয়েক মাসে তা আরও উষ্ণ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এই উষ্ণতা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়লে ২০২৭ সাল বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের জন্য নতুন একটি বড় সতর্কসংকেত হয়ে উঠতে পারে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ