সবুজ দক্ষতাই হতে পারে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের চাবিকাঠি

শহিদুল ইসলাম সুজনসম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক টেলিগ্রাম
🕙 প্রকাশিত : ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৪:০৬ এএম

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পৃথিবীর পরিবেশ ও ভৌগোলিক বাস্তবতাই বদলে দিচ্ছে না, এর প্রভাব পড়ছে কর্মজগতেও। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত সংকট, জ্বালানি রূপান্তর ও টেকসই উন্নয়ন আগামী দিনের চাকরির বাজারের ধরন পরিবর্তন করছে। ফলে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের জন্য শুধু ভালো ফলাফল বা একটি নির্দিষ্ট ডিগ্রি যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রয়োজন হবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অর্থনীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে কাজ করার দক্ষতা।

এই দক্ষতাকেই বলা হচ্ছে ‘গ্রিন স্কিল’ বা সবুজ দক্ষতা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, সবুজ ভবিষ্যতের জন্য এমন জ্ঞান ও সক্ষমতা প্রয়োজন, যা অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে সহায়তা করবে। তবে গ্রিন স্কিল শুধু পরিবেশবিজ্ঞান বা পরিবেশভিত্তিক পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনীতি, কৃষি, প্রকৌশল, নির্মাণ, পরিবহন, উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসাসহ প্রায় সব খাতেই এর গুরুত্ব বাড়ছে।

গ্রিন স্কিল কী

সহজ ভাষায়, পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং টেকসইভাবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও মানসিকতাই গ্রিন স্কিল।

এর মধ্যে রয়েছে শক্তি সাশ্রয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ, টেকসই কৃষি, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ, কার্বন নিঃসরণ কমানো, পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার জ্ঞান।

তবে গ্রিন স্কিল কেবল কারিগরি জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণী চিন্তা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, দলগতভাবে কাজ করা, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং পরিবেশগত সিদ্ধান্ত বোঝার সক্ষমতাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সবুজ কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক দক্ষতার সমন্বয় প্রয়োজন।

বদলে যাচ্ছে চাকরির বাজার

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকট এখন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়; এর সঙ্গে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সম্পর্কও গভীর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, বৈদ্যুতিক যানবাহন, টেকসই কৃষি, পরিবেশবান্ধব ভবন এবং কম-কার্বন উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এর ফলে প্রচলিত অনেক কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৫ সালের কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন বৈশ্বিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালক হবে। পরিবেশ প্রকৌশলী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৌশলীসহ পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশাকে দ্রুত বর্ধনশীল পেশার মধ্যে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশগত দায়িত্ববোধও দ্রুত বাড়তে থাকা দক্ষতার তালিকায় রয়েছে।

চাহিদা বাড়ছে, দক্ষতার ঘাটতিও রয়েছে

গ্রিন স্কিলের চাহিদা বাড়লেও দক্ষ কর্মীর সংখ্যা সেই হারে বাড়ছে না। ২০২২-২৩ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী গ্রিন স্কিল অর্জনকারী কর্মীর সংখ্যা ১২ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, অন্তত একটি গ্রিন স্কিল প্রয়োজন এমন চাকরির বিজ্ঞপ্তি বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ।

অর্থাৎ কর্মীদের সবুজ দক্ষতা বাড়লেও নিয়োগদাতাদের চাহিদা আরও দ্রুত বাড়ছে। ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে পরিবেশ-সম্পর্কিত জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত যোগ্যতা নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সব পেশাতেই প্রয়োজন সবুজ দক্ষতা

গ্রিন স্কিল অর্জনের জন্য পরিবেশ প্রকৌশলী হতে হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

একজন কৃষি শিক্ষার্থী মাটির স্বাস্থ্য, পানি সাশ্রয়ী সেচ ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। একজন প্রকৌশলী শক্তি-সাশ্রয়ী ভবন বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করতে পারেন। ব্যবসায় শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য কমানো, পরিবেশবান্ধব সরবরাহ ব্যবস্থা ও টেকসই ব্যবসা নিয়ে কাজ করতে পারেন।

একইভাবে তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষার্থী ডেটা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ বা সম্পদের অপচয় কমানোর প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করতে পারেন।

অর্থাৎ একটি বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের সঙ্গে পরিবেশগত দক্ষতা যুক্ত করে বিভিন্ন পেশায় গ্রিন স্কিল প্রয়োগ করা সম্ভব। সবুজ অর্থনীতির পরিবর্তন শুধু নতুন পেশা তৈরি করছে না, প্রচলিত পেশাগুলোর কাজের ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতাও বদলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। নদীভাঙন, বন্যা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নগর দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে।

তাই বাংলাদেশের জন্য পরিবেশজ্ঞান কোনো বৈশ্বিক ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব প্রয়োজন।

কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, নির্মাণ, নগর ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রযুক্তি—প্রতিটি খাতেই পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। শিক্ষার্থীরা যদি নিজেদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের সঙ্গে পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের ধারণা যুক্ত করতে পারে, তাহলে পরিবর্তিত কর্মবাজারের জন্য তারা আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারবে।

শিক্ষাব্যবস্থায়ও বাড়ছে গুরুত্ব

শুধু পরিবেশ নিয়ে একটি অধ্যায় পড়ানোই যথেষ্ট নয়—এমন ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থায়। শিক্ষার্থীর চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও কাজের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের ধারণা তৈরি করাও জরুরি।

শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য, সম্পদের অপচয় ও বৈষম্যের মতো সমস্যাগুলো বোঝার পাশাপাশি বাস্তব সমাধানে অংশ নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এমনকি ‘গ্রিন স্কুল’ ধারণাতেও শুধু শ্রেণিকক্ষে পরিবেশ শিক্ষা নয়; বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, পরিচালনা, শিক্ষাদান এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে টেকসই আচরণ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতের শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় পরিবেশ নিয়ে উত্তর লিখবে না; বরং পরিবেশগত সমস্যা শনাক্ত করবে, তথ্য বিশ্লেষণ করবে এবং বাস্তব সমাধান তৈরির চেষ্টা করবে।

তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ

সবুজ অর্থনীতির বিস্তারের ফলে একদিকে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, অন্যদিকে কিছু প্রচলিত কাজের ধরনও পরিবর্তিত হবে। সবুজ ও ডিজিটাল রূপান্তর কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন দক্ষতার মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তরুণদের জন্যও এতে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।

২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, সবুজ রূপান্তর ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মতো বিভিন্ন প্রবণতা বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক নতুন চাকরি সৃষ্টি এবং কিছু চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার কারণ হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কর্মীকে শুধু একটি নির্দিষ্ট পেশার জন্য নয়, পরিবর্তনশীল কর্মজগতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

একজন প্রকৌশলীকে শক্তি দক্ষতা সম্পর্কে জানতে হতে পারে, একজন কৃষিবিদকে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি বুঝতে হতে পারে, একজন ব্যবসায়ীকে টেকসই ব্যবসার ধারণা জানতে হতে পারে এবং একজন নগর পরিকল্পনাবিদকে পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হতে পারে।

কীভাবে অর্জন করা যায় গ্রিন স্কিল

গ্রিন স্কিল অর্জনের জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে পরিবেশবিজ্ঞানে আলাদা ডিগ্রি নিতে হবে—এমন ধারণা ভুল। নিজের পড়াশোনার বিষয়ের সঙ্গে পরিবেশগত জ্ঞান যুক্ত করাই হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ।

পরিবেশ, জলবায়ু, জ্বালানি, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নিয়মিত পড়াশোনা করা যেতে পারে। নিজের এলাকার কোনো পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে ছোট গবেষণা করা যায়। বিদ্যালয় বা কলেজে বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য পৃথকীকরণ, পানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় কিংবা পরিবেশ সচেতনতামূলক প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।

এর পাশাপাশি ডেটা বিশ্লেষণ, যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, গবেষণা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাও বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতের গ্রিন জব শুধু পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা থাকার বিষয় নয়; সেই জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতের প্রস্তুতি এখন থেকেই

আজকের শিক্ষার্থী যে চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেই কর্মক্ষেত্র পাঁচ বা দশ বছর পর আগের মতো নাও থাকতে পারে। প্রযুক্তির পাশাপাশি জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিবর্তনও কর্মজগতকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে।

তাই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার অর্থ শুধু কম্পিউটার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শেখা নয়; পৃথিবীর পরিবর্তনকেও বোঝা।

সবুজ দক্ষতা কোনো নির্দিষ্ট পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে কীভাবে কাজ করতে হবে, কীভাবে সম্পদ ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে পরিবেশগত সমস্যা সমাধান করতে হবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখতে হবে—এসব বিষয় বোঝার সক্ষমতাও গ্রিন স্কিলের অংশ।

যে শিক্ষার্থী এখন থেকেই পরিবেশকে শুধু পরীক্ষার একটি বিষয় হিসেবে না দেখে নিজের ভবিষ্যৎ পেশার অংশ হিসেবে দেখতে শিখবে, পরিবর্তিত কর্মবাজারে সে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকতে পারে। পৃথিবী যখন সবুজ অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে, তখন গ্রিন স্কিল শুধু পরিবেশ রক্ষার হাতিয়ার নয়; এটি ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ