হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ব্যয়, ভেরিয়েশন কাজ, চুক্তি বাস্তবায়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যকে আংশিক, প্রেক্ষাপটবিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সংস্থাটির দাবি, প্রকল্পের সব ব্যয় সরকার অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি), আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং নির্ধারিত বিধিমালা অনুসারেই সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।
রোববার (২৬ জুলাই) এক বিস্তারিত ব্যাখ্যায় বেবিচক জানায়, থার্ড টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় দুই বছর আগেই শেষ হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশনাল প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় সম্পন্ন করতে সময় লাগছে। বর্তমানে এসব প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে টার্মিনালটি চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে।
সংস্থাটি জানায়, অসম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশের কারণে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের ভাবমূর্তি, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আহরণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অনুমোদনহীন ব্যয়ের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান
অনুমোদন ছাড়াই ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ নাকচ করে বেবিচক জানায়, প্রকল্পের প্রতিটি ব্যয় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি), প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের ভিত্তিতেই করা হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে প্রকল্পের প্রথম ডিপিপি ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত হয়। আন্তর্জাতিক দরপত্রের পর ২০১৯ সালে সংশোধিত ডিপিপির ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা। পরে ভেরিয়েশন কাজসহ দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদন পায়। এখন পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা, যা অনুমোদিত ব্যয়সীমার মধ্যেই রয়েছে।
গাছ, পুকুর ও ভেরিয়েশন কাজের ব্যাখ্যা
সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য গাছ লাগানোর ব্যয় এবং পুকুর নির্মাণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে বেবিচক। সংস্থাটি জানায়, আন্তর্জাতিক দরপত্রের আওতায় মোট ১৪ হাজার ৮২৪টি আইটেমের সমন্বয়ে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। কোনো একটি আইটেমের মূল্য আলাদাভাবে তুলে ধরে পুরো প্রকল্পের ব্যয় মূল্যায়ন করা সঠিক নয়।
পুকুর নির্মাণের ব্যয়ের বিষয়ে বেবিচক জানায়, এতে বিদ্যমান জলাশয়ের কাদা অপসারণ, ঢাল তৈরি, কংক্রিট ব্লক দিয়ে পাড় বাঁধাই এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মাটি অপসারণ, ডিজেল পাম্প, ইউপিএস, জ্বালানি, সফট ওপেনিং ও দ্রুত কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের অভিযোগ প্রসঙ্গে সংস্থাটি জানায়, এসব ব্যয়ের অধিকাংশই আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান NOCD JV-এর নির্দেশনা ও অনুমোদনের ভিত্তিতে এবং FIDIC Conditions of Contract অনুসারে সম্পন্ন হওয়া ভেরিয়েশন কাজ। এসব ব্যয়ের জন্য সরকারেরও প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত জনবল, যন্ত্রপাতি ও উপকরণ ব্যবহার করতে হয়েছে বলেও জানায় বেবিচক। তাদের দাবি, চুক্তির বিধান অনুসারেই এসব অতিরিক্ত ব্যয় পরিশোধ করা হয়েছে।
অডিট আপত্তি নিয়ে অবস্থান
৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অনিয়ম বা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের অভিযোগ প্রসঙ্গে বেবিচক জানায়, এটি মূলত Foreign Aided Projects Audit Department (FAPAD)-এর একটি অডিট আপত্তি, যা এখনো নিষ্পত্তির পর্যায়ে রয়েছে।
সংস্থাটির ভাষ্য, ডিসপিউট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অডিট আপত্তির ভিত্তিতে ঠিকাদারের বিল আটকে রাখার সুযোগ ছিল না। পরে গঠিত Amicable Settlement Committee প্রকল্প ব্যয় থেকে ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে এবং অবশিষ্ট অর্থ চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারের প্রাপ্য বলে মত দিয়েছে। এ বিষয়ে অডিট আপত্তির জবাব প্রস্তুতের কাজ চলছে।
ব্যয়সীমা ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ব্যয়সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে বেবিচক। সংস্থাটি জানায়, চুক্তিতে উল্লেখিত ১ শতাংশ সীমা কেবল কাজের পরিমাণের হ্রাস-বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অতিরিক্ত ভেরিয়েশন কাজের ক্ষেত্রে নয়।
এ ছাড়া প্রকল্পের কারিগরি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল হক এবং কনট্রাক্ট স্পেশালিস্ট হারুন-অর-রশিদের বক্তব্য গণমাধ্যমে খণ্ডিত ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।
সরকারের অর্থ সাশ্রয়ের দাবি
অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য ছিল ঠিকাদারের বিভিন্ন দাবি পর্যালোচনার মাধ্যমে সরকারের আর্থিক দায় কমানো বলে জানিয়েছে বেবিচক। সংস্থাটির দাবি, ঠিকাদারের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত দাবিকে আলোচনার মাধ্যমে কমিয়ে ৬৬২ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে, ফলে সরকারের প্রায় ২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সবশেষে বেবিচক পুনর্ব্যক্ত করেছে, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অনিয়ম, অনুমোদনহীন ব্যয় কিংবা বিধিবহির্ভূত অর্থ পরিশোধের অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয়। সংস্থাটির মতে, প্রকল্পের সব ব্যয় অনুমোদিত দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপির আওতায় সম্পন্ন হয়েছে এবং পরবর্তীতে কোনো ‘পোস্ট-ফ্যাক্টো’ অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।
সূত্র: ইত্তেফাক

