মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ কৃষিজমিতে এখনো আমন ধান রয়েছে। অনেক জমিতে জমে আছে পানি। নতুন মৌসুমের প্রধান ফসল মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদও শুরু হয়নি। কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শিমুলিয়া, উলাইল ও মহাদেবপুর ইউনিয়নে আবাদ শুরু হতে আরও ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগবে। আর শিবালয়, আরুয়া, তেওতা ও উথুলি ইউনিয়নে নতুন আবাদ শুরু হতে সময় লাগবে প্রায় দুই মাস।
এর মধ্যেই চলতি অক্টোবর মাসে আগাম আবাদ শুরু হবে—এমন তিন ইউনিয়ন শিমুলিয়া, উলাইল ও মহাদেবপুরে কৃষকের সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল, আবাদ শুরুর সময় যেন কৃষকদের সারসংকটে পড়তে না হয়।
কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার কিনতে গেলেও তাঁদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় জৈব সার অথবা ‘হিউমিক সুপার’ কিনতে বলা হচ্ছে। এসব পণ্য না নিলে প্রয়োজনীয় সার দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কৃষক।
গত শনিবার শিমুলিয়ার তাড়াইল বাজারে এমন অভিযোগ করেন কয়েকজন কৃষক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, দুই বস্তা পটাশ কিনতে গেলে সঙ্গে এক বস্তা জৈব সার অথবা দুই প্যাকেট হিউমিক সুপার নিতে বলা হয়েছে। এসব পণ্যের প্রয়োজন নেই জানালেও রাসায়নিক সার পাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত সেগুলো নিতে হয়েছে।
উপজেলার উলাইল ইউনিয়নেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার বিকেল ও রোববার সকালে টেপড়া এলাকার সাহা ট্রেডার্সে গিয়ে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে অপ্রয়োজনীয় জৈব সার নেওয়ার এমন অভিযোগ পাওয়া যায়।
প্রশ্ন উঠছে, কৃষকের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বাড়তি সার বরাদ্দ দেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার কিনতে গিয়ে কেন তাঁদের অতিরিক্ত পণ্য নিতে হচ্ছে?
একজন ডিলারকে ২২২ টন সার
কৃষি বিভাগের বরাদ্দসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে শিমুলিয়া ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার আলামিনকে মোট ২২২ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫২ মেট্রিক টন টিএসপি, ১০৬ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ৬৪ মেট্রিক টন এমওপি।
বরাদ্দের অর্ধেক সার—২৬ মেট্রিক টন টিএসপি, ৫৩ মেট্রিক টন ডিএপি ও ৩২ মেট্রিক টন এমওপি—পাশের মহাদেবপুর ইউনিয়নের কৃষকদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশ রয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ইউনিয়নভিত্তিক আবাদ শুরুর সময় ও সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনা করেই এ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
‘দুই বস্তা পটাশের সঙ্গে এক বস্তা জৈব সার’
শনিবার দুপুরে তাড়াইল বাজারে আলামিনের হক ট্রেডার্সে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন কৃষক সার কিনছেন। কেউ অটোরিকশায় করে সার নিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, তাঁরা সরকারি নির্ধারিত দামেই রাসায়নিক সার কিনেছেন। তবে প্রয়োজনীয় সারের সঙ্গে জৈব সার ও হিউমিক সুপার নেওয়ার জন্য তাঁদের বলা হয়েছে।
পাচুরিয়া গ্রামের কৃষক পান্নু, সুমন ও সাঈদ বলেন, তাঁদের জমির জন্য যতটুকু রাসায়নিক সার প্রয়োজন, তাঁরা ততটুকুই নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সঙ্গে অন্য সার নেওয়ার কথা বলা হয়। প্রয়োজন না থাকলেও রাসায়নিক সার পেতে সেগুলো কিনতে হয়েছে।
কৃষকদের কয়েকজন বলেন, তাঁদের বাড়িতে পর্যাপ্ত গোবর রয়েছে। জমিতে তাঁরা সেটিই জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে দোকান থেকে আলাদা করে জৈব সার কেনার প্রয়োজন নেই।
তবে কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিলার আলামিন। তিনি বলেন, কৃষকের চাহিদা অনুযায়ীই সার দেওয়া হচ্ছে। কেউ জৈব সার বা হিউমিক সুপার নিতে না চাইলে তাঁকে জোর করা হচ্ছে না। কৃষকেরা নিজেদের প্রয়োজনেই এসব পণ্য নিচ্ছেন।
তাড়াইল বাজারে ডিলারের সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে উপস্থিত হন শিমুলিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্লক অফিসার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন। কৃষকদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, কৃষকেরা তাঁকে জানিয়েছেন, তাঁদের অপ্রয়োজনীয় জৈব সার ও হিউমিক সুপার নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। বিষয়টি তিনি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে জানাবেন।
উলাইলেও একই অভিযোগ
শিমুলিয়ার পাশাপাশি উলাইল ইউনিয়নের টেপড়া এলাকার সাহা ট্রেডার্সেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শনিবার বিকেল ও রোববার সকালে সেখানে গিয়ে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার কিনতে গেলে তাঁদের সঙ্গে জৈব সার নেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কৃষক বলেন, তাঁদের বাড়িতে গোবর রয়েছে এবং জমিতে সেটিই ব্যবহার করেন। কিন্তু দোকান থেকে রাসায়নিক সার নিতে গেলে জৈব সার না নিলে সার দেওয়া হবে না বলে তাঁদের জানানো হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে জৈব সার কিনতে হয়েছে।
তবে জৈব সার নিতে বাধ্য করার অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি সাহা ট্রেডার্সের মালিক রতন সাহা।
অন্য উপজেলায়ও বিক্রির অভিযোগ
রতন সাহা উলাইল ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দ করা সার পাশের ঘিওর উপজেলাতেও বিক্রি করেন—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘিওরের মৌহালী গ্রামের কৃষক মজনুর কাছে বিভিন্ন ধরনের ৩০ বস্তা রাসায়নিক সার বিক্রির ক্ষেত্রে তাঁকে আরও ২০ বস্তা জৈব সার নিতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি স্বীকার করে রতন সাহা বলেন, ‘মৌহালী আমার শ্বশুরবাড়ি। মজনু এসে বলল, সে কোথাও সার পাচ্ছে না। প্রয়োজনে ২০ বস্তা জৈব সার নেবে, তবুও যেন তাকে ৩০ বস্তা রাসায়নিক সার দেওয়া হয়। এ কারণে তাকে সার দিয়েছি।’
‘টিএসপি ৩ তারিখেই শেষ’
টেপড়া এলাকার সাহা ট্রেডার্সে গিয়ে আরও দেখা যায়, কৃষকেরা পটাশ, ডিএপি ও ইউরিয়া পেলেও টিএসপি পাচ্ছেন না। কৃষকেরা জানান, তাঁদের টিএসপি প্রয়োজন হলেও দোকানে তা নেই।
সাহা ট্রেডার্সের মালিক রতন সাহা বলেন, অক্টোবর মাসে তাঁদের ৩০ টন টিএসপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেটি শেষ হয়ে গেছে। তবে জরুরি প্রয়োজনের জন্য ৫০ বস্তা টিএসপি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।
অক্টোবরের শুরুতেই একটি ইউনিয়নের একজন ডিলারের ৩০ টন টিএসপি শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ওই ইউনিয়নসহ শিমুলিয়া ও মহাদেবপুরে এখনো বড় পরিসরে নতুন মৌসুমের আবাদ শুরু হয়নি।
কৃষকদের অপ্রয়োজনীয় সার নিতে বাধ্য করার অভিযোগ এবং অক্টোবরের শুরুতেই টিএসপি শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শিবালয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুজন কুমার ভৌমিক বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।









