বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও অভিযোজন কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রশংসা অর্জন করলেও প্রতিবন্ধী মানুষ, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুরা এখনও এসব উদ্যোগের বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই ও কার্যকর জলবায়ু অভিযোজন নিশ্চিত করতে হলে এই জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথভাবে পরিচালিত জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ (এনএসপিডি-২০২১) অনুযায়ী, দেশে প্রতিবন্ধিতার হার ২ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে বিস্তৃত সংজ্ঞায় এ হার ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। একই জরিপে দেখা যায়, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিবন্ধিতার হারও বাড়তে থাকে।
ইউনিসেফের শিশু জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে ১৬৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম। দেশের প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ শিশু বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রায় ৬০ শতাংশ কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পায় না, ফলে জলবায়ুজনিত দুর্যোগে তাদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, প্রতিবন্ধিতাজনিত অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছায়। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি।
যদিও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি ২০২৩-২০৫০) এবং এনডিসি ৩.০-এ প্রতিবন্ধী মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে, তবে বাস্তবায়নে এখনও ঘাটতি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবন্ধিতা-নির্দিষ্ট কৌশল, পর্যাপ্ত বাজেট ও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাব এ ক্ষেত্রে বড় বাধা।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, জলবায়ু অভিযোজনমূলক এনজিও কার্যক্রমে নারী ও প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। উত্তরদাতাদের মাত্র ২৭ শতাংশ মনে করেন, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে প্রকৃত অর্থে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
২০২২ সালের সুনামগঞ্জ-সিলেটের ভয়াবহ বন্যার সময়ও বহু প্রতিবন্ধী মানুষ প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। একইভাবে অনেক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে র্যাম্প থাকলেও ব্যবহারযোগ্য টয়লেট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামো নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে।
তবে ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড় রিমালের সময় খুলনার মোংলায় প্রতিবন্ধী শিশু ফাউন্ডেশন ও কারিতাস বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে গঠিত দুর্যোগ সাড়াদান দলগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাই নেতৃত্ব দেন। এতে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা তৈরি সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর জলবায়ু অভিযোজন নিশ্চিত করতে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর পৃথক তথ্যভান্ডার তৈরি, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, জবাবদিহি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই হবে।

