গবেষণায় সততার সংকট: জ্ঞানচর্চার ভিত্তি রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ প্রয়োজন

শহিদুল ইসলাম সুজনসম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক টেলিগ্রাম
🕙 প্রকাশিত : ২ আগস্ট, ২০২৬ । ১:৪৪ পিএম

একটি মিথ্যা কখনো একা জন্ম নেয় না। একটি অসত্যকে টিকিয়ে রাখতে আরও বহু অসত্যের আশ্রয় নিতে হয়। একসময় সেই মিথ্যার স্তূপ এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে সত্যকেই অস্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে। গবেষণার মতো সত্যনির্ভর জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও যখন এমন প্রবণতা দেখা দেয়, তখন তা শুধু একজন গবেষকের নয়, পুরো দেশের একাডেমিক মর্যাদার জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক সাময়িকী থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব প্রত্যাহারের পেছনে ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, তথ্যের অসংগতি, চৌর্যবৃত্তি, একই উপাত্তের পুনর্ব্যবহার, উদ্ধৃতি কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি এবং অর্থের বিনিময়ে লেখকস্বত্ব বাণিজ্যের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

গবেষণাপত্র প্রত্যাহারকে কেবল একজন গবেষকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রকাশিত প্রতিটি গবেষণা একটি দেশের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা-সংস্কৃতি এবং একাডেমিক মানের প্রতিনিধিত্ব করে। সেই গবেষণাই যদি অনিয়ম বা জালিয়াতির কারণে প্রত্যাহৃত হয়, তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা সমাজে দেশের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। এর ফলে সৎ, দক্ষ ও পরিশ্রমী গবেষকদেরও ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন কঠিন হয়ে যেতে পারে।

এই অবক্ষয়ের কারণ শুধু ব্যক্তিগত অসততা নয়; এর পেছনে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ও অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতাও। বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতি, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের র‌্যাংকিং, আর্থিক প্রণোদনা, ‘সেরা গবেষক’ হওয়ার প্রতিযোগিতা এবং দ্রুত গবেষণাপত্র প্রকাশের চাপ অনেক ক্ষেত্রেই গবেষণাকে জ্ঞানসাধনার পরিবর্তে সংখ্যার খেলায় পরিণত করেছে। গবেষণার গুণগত উৎকর্ষের পরিবর্তে প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা যেন সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড হয়ে উঠেছে।

গবেষণায় তথ্য বিকৃত করা, অন্যের লেখা নিজের নামে প্রকাশ করা কিংবা ভুয়া মূল্যায়নের আশ্রয় নেওয়া শুধু পেশাগত অনৈতিকতা নয়—এটি জ্ঞানের বিরুদ্ধে এক ধরনের অপরাধ। কারণ বিজ্ঞান ও গবেষণার ভিত্তি গড়ে ওঠে বিশ্বাসের ওপর। সেই বিশ্বাস নষ্ট হলে গবেষণার ফলাফল, নীতিনির্ধারণ, শিক্ষা এবং সমাজের উন্নয়ন—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগের পরও যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। কোথাও শুধু সতর্কবার্তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়, আবার কোথাও স্পষ্ট নীতিমালার অভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গবেষণা জালিয়াতি একটি গুরুতর একাডেমিক অপরাধ, যার কঠোর শাস্তি ও স্বচ্ছ তদন্ত অপরিহার্য।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন গবেষণা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন গবেষণা-নৈতিকতা কমিটি গঠন, গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার আগে বাধ্যতামূলক চৌর্যবৃত্তি পরীক্ষা, গবেষণার উপাত্ত সংরক্ষণে স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পদোন্নতি ও পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে গবেষণার সংখ্যা নয়, বরং গুণমান, মৌলিকত্ব, প্রভাব এবং সততাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

গবেষকদেরও মনে রাখতে হবে, গবেষণা কোনো উৎপাদনশীল কারখানা নয় যেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর ফলাফল তৈরি করতে হবে। একটি সৎ গবেষণা শত ভুয়া গবেষণার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। একটি সত্যনিষ্ঠ আবিষ্কার হাজার কৃত্রিম উদ্ধৃতির চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী এবং মানবকল্যাণে কার্যকর।

একটি দেশের বৌদ্ধিক অগ্রগতি নির্ভর করে সত্যের প্রতি তার অঙ্গীকারের ওপর। গবেষণার সততা রক্ষা মানে শুধু কয়েকটি গবেষণাপত্রকে সুরক্ষিত রাখা নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞানভিত্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্মান অক্ষুণ্ন রাখা। সাময়িক লাভের আশায় চৌর্যবৃত্তি বা অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়তো কিছু সময়ের জন্য সফলতার ভ্রম তৈরি করতে পারে, কিন্তু সত্য একদিন না একদিন প্রকাশিত হবেই। তাই গবেষণাসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততার কোনো বিকল্প নেই।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ