জলাবদ্ধতার সংকট থেকে শিক্ষা নেওয়ার এখনই সময়

🕙 প্রকাশিত : ১৪ জুলাই, ২০২৬ । ১২:৫৯ পিএম

রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা চলতি বর্ষায় নজিরবিহীন জলাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা নগরবাসীর পরিচিত দুর্ভোগ হলেও এবারের পরিস্থিতি সেই চিত্রকেও ছাড়িয়ে গেছে। অনেক এলাকায় মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোমরসমান পানিতে আটকে ছিলেন। অচল হয়ে পড়ে যানবাহন চলাচল, স্থবির হয়ে যায় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবাসহ দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কার্যক্রম।

ভুক্তভোগীদের অনেকেই জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এত ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তারা দেখেননি। ফলে প্রতি বছর বর্ষা ও বন্যার পানিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার পেছনে দায় ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।

জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। নগরীর ড্রেন, খাল ও জলাশয় আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে অল্প সময়ের বৃষ্টিপাতও বড় ধরনের দুর্ভোগে রূপ নিচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, জলাবদ্ধতা শুধু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ফল নয়; নাগরিক অসচেতনতা ও পরিবেশবিরোধী আচরণও এর জন্য সমানভাবে দায়ী। ব্যবহৃত পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে না ফেলার কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

সম্প্রতি এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছোটবেলা থেকেই ব্যবহৃত টিস্যু নির্ধারিত স্থানে ফেলার অভ্যাসের কথা উল্লেখ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে এমন ছোট ছোট নাগরিক অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাপান, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থার পেছনে নাগরিক দায়িত্ববোধ ও আত্মশৃঙ্খলা বড় ভূমিকা পালন করেছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দায়িত্ব কেবল নাগরিকদের নয়। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর ড্রেনেজ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে সমন্বয়হীনতা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভুগছে। বর্ষা মৌসুমে খোলা ম্যানহোল কিংবা বিদ্যুতায়িত পানিতে প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অথচ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং দায় এড়ানোর প্রবণতা সমস্যার সমাধানকে আরও কঠিন করে তুলছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ দখল ও ভরাট করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নির্বিচারে গাছ কাটা, জলাশয় ভরাট, প্লাস্টিক দূষণ এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ ও আকস্মিক বন্যার মতো দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

তাদের মতে, চলতি বর্ষার ভয়াবহ জলাবদ্ধতা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে, পাশাপাশি নদী, খাল ও জলাশয় দখলমুক্ত এবং দূষণমুক্ত রাখার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।

একই সঙ্গে নাগরিকদেরও পরিবেশবান্ধব জীবনাচরণে অভ্যস্ত হতে হবে। ব্যবহৃত টিস্যু, পলিথিন বা যেকোনো বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলার মতো ছোট ছোট অভ্যাসই ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয় প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে পয়োনিষ্কাশন ও অন্যান্য নগরসেবাকে একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষের আওতায় এনে কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার কারণে নগরবাসীকে প্রতি বছর একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ