জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট আগ্রাসনে বাড়ছে সুন্দরবনের সংকট

শহিদুল ইসলাম সুজনসম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক টেলিগ্রাম
🕙 প্রকাশিত : ২৮ জুলাই, ২০২৬ । ৫:১২ এএম

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন আগ্রাসনের কারণে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। লবণাক্ততার বিস্তার, শিল্প দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, অবৈধ শিকার, অপরিকল্পিত পর্যটন ও বন উজাড়সহ নানা কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত এ বনভূমির জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা সুন্দরবন রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর অধিকাংশ ম্যানগ্রোভ বনে দুই থেকে তিন ধরনের শ্বাসমূলবিশিষ্ট গাছ থাকলেও সুন্দরবনে রয়েছে ছয় ধরনের শ্বাসমূল, যা এ বনকে অনন্য বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অল্প উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। গত চার দশকে উজান থেকে স্বাদুপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে স্বাদুপানিনির্ভর উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।

সরকার সুন্দরবনের ৫২ শতাংশ এলাকাকে অভয়ারণ্য এবং চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী এসব এলাকায় ভারী শিল্প স্থাপন নিষিদ্ধ হলেও বিশেষজ্ঞদের দাবি, গত এক দশকে বনসংলগ্ন এলাকায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সিমেন্ট কারখানা, এলপি গ্যাস প্ল্যান্ট, অয়েল রিফাইনারিসহ প্রায় ৫০টি ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

পরিবেশবিদদের মতে, এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে নির্গত অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ও দূষিত পানি নদী ও খালের মাধ্যমে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। এতে জলজ প্রাণী, বনজ উদ্ভিদ এবং নতুন চারার বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে প্লাস্টিক দূষণ ও অপরিকল্পিত পর্যটনও সুন্দরবনের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর দুই লাখেরও বেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। পাশাপাশি বনসংলগ্ন এলাকায় অনুমোদনহীন কটেজ ও রিসোর্ট গড়ে ওঠায় পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। জেনারেটরের শব্দ ও উচ্চস্বরে গান বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

নৌপথে চলাচলকারী জাহাজ থেকে নিঃসৃত তেল, বর্জ্য ও হাইড্রোলিক হর্নের শব্দও বন ও নদীর পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এক গবেষণায় সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাস্তুতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আইইউসিএনের ২০১৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের অংশের সুন্দরবন থেকে ইতোমধ্যে ১৯ প্রজাতির পাখি, ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং একটি সরীসৃপ আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে।

এছাড়া বিষ দিয়ে মাছ শিকার, বাঘ, হরিণ, কুমির, সাপ ও তক্ষকসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী শিকার এবং অবৈধভাবে গাছ কাটার ঘটনাও বনটির জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

তবে বন বিভাগ জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর সংখ্যা সার্বিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং তার খাদ্যতালিকাভুক্ত প্রাণীর সংখ্যা বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

বন কর্মকর্তারা জানান, সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে বন বিভাগ, র‌্যাব, পুলিশ ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। নদী ও খালের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কমিউনিটিভিত্তিক বন সুরক্ষা কার্যক্রম এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস উপলক্ষে সচেতনতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সুন্দরবন রক্ষায় বনভূমির ভেতর ও আশপাশে সব ধরনের দূষণ, অবৈধ শিল্পায়ন ও পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ