জলবায়ু পরিবর্তনে ইউরোপে খরা তীব্রতর, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ

শহিদুল ইসলাম সুজনসম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক টেলিগ্রাম
🕙 প্রকাশিত : ২৩ জুলাই, ২০২৬ । ৬:০৭ এএম

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরার প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুধু বৃষ্টিপাতের ঘাটতি নয়, বরং অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে দ্রুত পানি বাষ্পীভূত হওয়াই এবারের খরার প্রধান কারণ। এর ফলে কৃষি উৎপাদন, জ্বালানি খাত, নৌপরিবহন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রেকর্ডসংখ্যক তাপপ্রবাহের কারণে নদী, হ্রদ, জলাধার, মাটি ও উদ্ভিদ থেকে অস্বাভাবিক হারে পানি বাষ্পীভূত হচ্ছে। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পশ্চিম ইউরোপে এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা প্রায় ৮০ গুণ এবং পূর্ব ইউরোপে প্রায় ৪০ গুণ বেড়েছে। পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণের কারণে মাটির আর্দ্রতাও দ্রুত কমে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, অতীতে খরার প্রধান কারণ হিসেবে বৃষ্টিপাতের ঘাটতিকে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে উচ্চ তাপমাত্রা খরার সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে। গত শীত মৌসুমে পশ্চিম ইউরোপে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলেও এবারের গ্রীষ্মে তীব্র খরা দেখা দেওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে।

খরার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পানির ব্যবহার সীমিত করতে জরুরি বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। দক্ষিণ ইংল্যান্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় হোসপাইপ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্পেন ও ফ্রান্সে দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এবং কৃষি খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে, চলতি বছরে ইউরোপে প্রায় ৯০ লাখ টন শস্য উৎপাদন কমে যেতে পারে। ফ্রান্সে গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ভুট্টা উৎপাদনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রোমানিয়ায় ১০ লাখ হেক্টরের বেশি কৃষিজমির ফসল নষ্ট হয়েছে।

নদ-নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং পণ্যবাহী নৌযান চলাচলেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের রাইন নদীর পানির স্তর ১৯৭৬ সালের ঐতিহাসিক খরার সময়ের চেয়েও নিচে নেমে গেছে। গবেষকদের মতে, এর প্রভাবে খাদ্য ও জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর।

গবেষণা দলের সদস্য ড. ডমিনিক শুমাখার বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ধারণক্ষমতাও বাড়ছে। ফলে নদী, হ্রদ, জলাধার ও মাটি থেকে দ্রুত পানি হারিয়ে যাচ্ছে এবং গ্রীষ্ম শুরু হওয়ার আগেই মাটি অস্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে পড়ছে। তিনি জানান, ২০২৬ সালের খরা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় দুই মাস আগে শুরু হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করে।

অন্য গবেষক ড. মারিয়াম জাকারিয়া বলেন, শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ভবিষ্যতে তা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে এ ধরনের চরম খরার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। তাই দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো না গেলে ইউরোপকে আরও ঘন ঘন তীব্র খরা ও তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে হবে।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিল বলেন, ক্রমবর্ধমান খরা পৃথিবীর অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে ওঠার স্পষ্ট সতর্কসংকেত। তাঁর মতে, কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর না ঘটলে জলবায়ুজনিত খরা আরও তীব্র হবে এবং এর অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়বে।

ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই ২০২৬ সালের ইউরোপের খরাকে উল্লেখযোগ্যভাবে আরও তীব্র করেছে। একই সঙ্গে জুনের শেষের ভয়াবহ তাপপ্রবাহ জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া ঘটার সম্ভাবনা ছিল না বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই তাপপ্রবাহে ইউরোপে প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যে অতিরিক্ত গরমের কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে অর্থনীতিতে এক বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে পৃথক এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ