রবিবার

৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি, সরকারের কৌশলী পদক্ষেপে আস্থা

🕙 প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল, ২০২৬ । ১:১৪ অপরাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত চাপ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। তেল পরিবহন রুটে অনিশ্চয়তা, নিষেধাজ্ঞা ও সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ সংকট ও মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মতো জ্বালানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও।

তবে এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সরকার যে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে সাময়িক স্বস্তির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সাম্প্রতিক উদ্যোগে দেশে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। চলতি মাসেই বড় পরিমাণ ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের চালান দেশে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বিশেষ করে ৬০ হাজার টন ডিজেলবাহী দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের নিশ্চয়তা দিয়েছে। পাশাপাশি এপ্রিলজুড়ে ধাপে ধাপে আরও কয়েক লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির সূচি সরকারের আগাম প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।

জ্বালানি আমদানিতে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখীকরণের কৌশল গ্রহণ করেছে সরকার। সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ছাড়াও নাইজেরিয়া, কাজাখস্তান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ তৈরি করলেও কূটনৈতিক তৎপরতায় জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে, যা বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আগাম জ্বালানি ক্রয়, নতুন সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে সরবরাহ সচল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে তিন মাসের অগ্রিম মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহেও স্বস্তি রয়েছে। বেসরকারি শোধনাগারের উৎপাদন ও আমদানির সমন্বয়ে চাহিদা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে অকটেনকে পেট্রোলে রূপান্তরের বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) নিজস্ব মজুত ও নতুন অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি সংকট অনেক সময় বাজারের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ায় তীব্র হয়। তবে সরকার ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত ও স্বচ্ছ তথ্য দেওয়ায় বাজারে আস্থা ফিরেছে।

এছাড়া রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির সম্ভাবনা এবং বিকল্প বন্দর ব্যবহারের উদ্যোগ সরকারের দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নতুন সরবরাহকারীদের ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সৌর ও বায়ুশক্তির মতো বিকল্প উৎসে বিনিয়োগ বাড়ালে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বৈশ্বিক বাজারের প্রভাবও সীমিত থাকবে।

সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ, কূটনৈতিক তৎপরতা ও বহুমুখী জ্বালানি কৌশল দেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এটি কেবল একটি সংকট মোকাবিলার চিত্র নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরির ইঙ্গিতও বহন করে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ