শিরোনাম
Advertisement
সারাদেশ

মানিকগঞ্জে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী

Advertisement
মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা চলছে।

দীর্ঘদিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুড়ী ইউনিয়নের শোলধারা গ্রামের রাব্বি হোসেন (১৮)। গত ৫ অক্টোবর দুপুরে তাঁকে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রক্ত পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বারান্দায় তাঁর চিকিৎসা চলছে। একই হাসপাতালে ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় ভর্তি হয়েছেন মানিকগঞ্জ পৌরসভার চর বেউথা এলাকার সানি (২৭)। জ্বর নিয়ে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে রক্ত পরীক্ষা করালে তাঁরও ডেঙ্গু ধরা পড়ে।

রাব্বি ও সানির মতো মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে আসছেন। ৭ অক্টোবর পর্যন্ত সদর হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ১৯ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। শুধু এই হাসপাতালেই এ বছর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ২৯৫ জনের। আর জেলার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক মিলিয়ে চলতি বছরের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৬২ জন। তিন বছরের মধ্যে একই সময়ে এটিই সর্বোচ্চ রোগী শনাক্তের সংখ্যা।

মানিকগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দৈনিক ডেঙ্গু প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে ১১৯ জন বা প্রায় ১০ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের তুলনায় বেড়েছে ৬০১ জন বা প্রায় ৭৯ শতাংশ।

হাসপাতালে ভর্তি ৯৮ জন
৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। এর মধ্যে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৬ জন, মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৯, সদর হাসপাতালে ১৯, সাটুরিয়ায় ৮ এবং ঘিওরে ৬ জন ভর্তি রয়েছেন।

এ পর্যন্ত হাসপাতালগুলো থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ২৬৪ জন। গত বছরের একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৫৩ জন। ২০২৪ সালে ছিলেন ৮৪ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চলতি বছর একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগী বেড়েছে ৪৫ জন বা প্রায় ৮৫ শতাংশ।

সদর হাসপাতালে ভর্তি রাব্বির স্বজনেরা জানান, কয়েক দিন ধরে জ্বর থাকায় তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়। পরীক্ষার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এখন হাসপাতালেই তাঁর চিকিৎসা চলছে। আর সানির পরিবারের সদস্যরা জানান, জ্বর হওয়ায় প্রথমে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে রক্ত পরীক্ষা করানো হয়। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর তাঁকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি রোগী মুন্নু মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ৩৪৮ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এরপর মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ৩২৮ এবং সদর হাসপাতালে ২৯৫ জন। এ ছাড়া সাটুরিয়ায় ১৬০, ঘিওরে ৬৪, শিবালয়ে ৪৭, সিংগাইরে ৪৪, হরিরামপুরে ৪৪ এবং দৌলতপুরে ৩২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

মুন্নু মেডিকেল কলেজ, মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও সদর হাসপাতালে মোট ৯৭১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। জেলার মোট শনাক্ত রোগীর প্রায় ৭১ শতাংশই এই তিন প্রতিষ্ঠানে।

এক বছরে বেড়েছে ১১৯ রোগী
২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত মানিকগঞ্জে সরকারি হাসপাতালে ৯৭০ এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ২৭৩ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। সব মিলিয়ে রোগী ছিল ১ হাজার ২৪৩ জন। চলতি বছরের একই সময়ে সরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ১৪ এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৩৪৮ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। মোট রোগী ১ হাজার ৩৬২ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারি হাসপাতালে রোগী বেড়েছে ৪৪ জন। আর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বেড়েছে ৭৫ জন।

দুই বছরের ব্যবধানে রোগী বেড়েছে ৭৯ শতাংশ
তিন বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত মানিকগঞ্জে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল ৭৬১ জনের। ২০২৫ সালে একই সময়ে রোগী বেড়ে হয় ১ হাজার ২৪৩ জন। চলতি বছর তা আরও বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩৬২ জন।

এ বছর প্রথম মৃত্যুর তথ্য
২০২৪ ও ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে মানিকগঞ্জে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর তথ্য ছিল না। চলতি বছর অবশ্য জানুয়ারি থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত একজনের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

চিকিৎসক যা বলছেন
মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিকিৎসক মানবেন্দ্র সরকার বলেন, আগের তুলনায় ডেঙ্গুর প্রজননক্ষমতা বেড়েছে। এবার প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। পাশাপাশি মানুষের অসচেতনতার কারণেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

মেডিসিন বিভাগের এই চিকিৎসক বলেন, জ্বর হলে প্রথম তিন দিন পর্যাপ্ত তরলজাতীয় খাবার ও ফলমূল খেতে হবে। এরপরও জ্বর না কমলে নাপা (প্যারাসিটামল) সেবন করতে হবে। তাতেও জ্বর না কমলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
মানবেন্দ্র সরকার বলেন, জ্বরের সঙ্গে পেটে ব্যথা ও বমি হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আইভী ফেরদৌস বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও হাসপাতালে তাঁদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সিভিল সার্জন বলেন, বাড়ির আঙিনা ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা গেলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। তিনি সবাইকে দিনের বেলায়ও মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো, জ্বর হলে সময়মতো হাসপাতালে যাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান।

এ বিভাগের আরও সংবাদ