পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়—এটি জাতীয় নিরাপত্তা, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং বহুত্ববাদী সমাজ কাঠামোর একটি সংবেদনশীল ক্ষেত্র। সাম্প্রতিক সময়ে ‘আদিবাসী’ শব্দকে ঘিরে যে বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে, তা কেবল ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক প্রশ্ন নয়; বরং এটি রাজনৈতিক, আইনি এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
২০০৭ সালে জাতিসংঘের ‘ইউএনডিআরআইপি’ ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে আদিবাসী অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তবে বাংলাদেশ এখনো এই ঘোষণাপত্র বা আইএলও কনভেনশন ১৬৯ গ্রহণ করেনি। সরকার এর পেছনে যে যুক্তি তুলে ধরে, তা মূলত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সংবিধানসম্মত কাঠামো রক্ষার বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আইএলও কনভেনশন ১০৭ গ্রহণ করে, যেখানে ‘Indigenous’ ও ‘Tribal’—এই দুই পরিচয়কে পৃথকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। দেশের সংবিধানেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ বা ‘নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকার মনে করে, বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই এসব জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, আইএলও ১৬৯ ও ইউএনডিআরআইপি-র কিছু ধারা—বিশেষ করে আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বায়ত্তশাসন, ভূমি ও সম্পদের অধিকার—নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব ধারার বিস্তৃত ব্যাখ্যা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ও নীতিনির্ধারণে জটিলতা তৈরি করতে পারে। আবার সমর্থকদের দাবি, এগুলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস ও জনসংখ্যাগত গঠনের প্রশ্নটিও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও মতামতে দেখা যায়, এ অঞ্চলের নৃগোষ্ঠীগুলোর উৎপত্তি ও বসতি স্থাপনের ইতিহাস নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। ফলে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের প্রশ্নটি একমাত্রিক নয়, বরং এটি একটি জটিল ও সংবেদনশীল ইস্যু।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তিতে ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহৃত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ‘আদিবাসী’ পরিচয়কে সামনে এনে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ এটিকে অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে আন্তর্জাতিক প্রভাব বা ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীলতা, শান্তি এবং সকল জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা। পরিচয়ের প্রশ্নে বিভাজন নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, সংলাপ এবং সংবিধানসম্মত সমাধানই হতে পারে টেকসই পথ।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, তেমনি দেশের সব নাগরিক—পাহাড় ও সমতল নির্বিশেষে—সমান সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিতর্কের এই সময়ে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, সহনশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম: ‘আদিবাসী’ বিতর্ক, রাষ্ট্রের স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা
🕙 প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ । ১২:১০ অপরাহ্ণ

