বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও স্মরণীয় নাম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি ছিলেন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সেক্টর কমান্ডার, রাষ্ট্রনায়ক এবং আধুনিক বাংলাদেশের উন্নয়নের পথিকৃৎ। তাঁর কর্মময় জীবন, দেশপ্রেম, নেতৃত্বগুণ এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেন এবং একজন দক্ষ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২৬ মার্চের প্রাক্কালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুদ্ধ চলাকালে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং পরে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে অসামান্য বীরত্ব ও নেতৃত্বের পরিচয় দেন। তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে “বীর উত্তম” খেতাবে ভূষিত করা হয়।স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব ঘটে। জাতীয় সংকটময় পরিস্থিতিতে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ থেকে ৩০ মে ১৯৮১ পর্যন্ত। অর্থাৎ তাঁর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শাসনামল ছিল প্রায় ৪ বছর ১ মাস ৯ দিন। তবে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে, তিনি ১৯৭৫ সালের নভেম্বর থেকে ধীরে ধীরে দেশের কার্যকর শাসনক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন এবং ১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। সে হিসেবে তাঁর প্রভাবশালী শাসনকালকে অনেক গবেষক প্রায় সাড়ে ৫ বছর (১৯৭৫–১৯৮১) ধরে বিবেচনা করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান ওআইসির মধ্যে বাংলাদেশের প্রভাব বৃদ্ধি এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আত্মনির্ভরশীলতার পথে অগ্রসর হতে শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান-এর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে সাধারণভাবে একমত যে তাঁর শাসনামলেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জনশক্তি রপ্তানি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ভিত্তি গড়ে ওঠে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশেও সাংস্কৃতিক পরিচয় ও জাতীয় চেতনাকে রক্ষা করার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন যে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাও একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য। তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদ গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবিলায় তিনি যে নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন, তা বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, লোকজ ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক রীতি-নীতি ও জীবনদর্শনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটি জাতির সংস্কৃতি। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী দুর্বল জাতিগোষ্ঠীর উপর নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছে। এই প্রক্রিয়াকে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বলা হয়। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে একটি জাতি তার নিজস্ব ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও স্বকীয়তা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে দুর্বল করে বিদেশি সংস্কৃতি বা চিন্তাধারাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। গণমাধ্যম, শিক্ষা, সাহিত্য, বিনোদন, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন পরিচালিত হতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নানা রূপে দেখা যায়। বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, দেশীয় শিল্প-সাহিত্যের অবমূল্যায়ন, লোকজ সংস্কৃতির প্রতি অনীহা এবং জাতীয় ইতিহাস সম্পর্কে উদাসীনতা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ অবস্থায় জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রিক দায়িত্বে পরিণত হয়। সেই রাষ্ট্রিক দায়িত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অত্যন্ত সুচারু ভাবে পালন করেছিলেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনগণের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং জীবনবোধ রয়েছে, যা জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”।বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে তিনি দেশের জনগণকে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তার অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব, ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জনগণের সম্মিলিত পরিচয়কে শক্তিশালী করা। তিনি মনে করতেন যে জাতীয় ঐক্য ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ অপরিহার্য। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অন্যতম অবদান ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রতিষ্ঠা। তিনি জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয় ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের চেতনা জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। এই দর্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এর ফলে জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে নতুন আলোচনা সৃষ্টি হয় এবং দেশের মানুষ নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শুরু করে। জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা দেশের জনগণকে বিদেশি সাংস্কৃতিক প্রভাবের অন্ধ অনুসরণ থেকে বিরত থেকে নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি আস্থা রাখতে উৎসাহিত করে। ফলে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি মানসিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশীয় সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্পকলার বিকাশে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একটি জাতির সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে হলে তার শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে। তাঁর শাসনামলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে উৎসাহ প্রদান করা হয় এবং জাতীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক চর্চা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান, পুরস্কার ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ চালু করেছিলেন এবং কিছু বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন। যেমন ১৯৭৬ সালে শিশুদের সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি জিয়াউর রহমানের আমলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এরপর ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার। তিনি সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাঙামাটিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট এবং নেত্রকোনার বিরিশিরিতে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তার আমলে নেওয়া হয়। এছাড়াও তাঁর সময়েই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য ঢাকার অদূরে গাজীপুরে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘চলচ্চিত্র নগরী’ (ফিল্ম সিটি), ‘ফিল্ম ইনস্টিটিউট’ এবং ‘ফিল্ম আর্কাইভ’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক পুরস্কারের প্রবর্তন তিনিই করেন।সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে একুশে পদক (১৯৭৬), স্বাধীনতা পদক (১৯৭৭), বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (প্রথম প্রদান ১৯৭৯) চালু বা প্রবর্তনের কৃতিত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের। তাঁর সময়েই “বাংলা একাডেমি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮” জারি করে প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামো ও কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা হয়। জিয়াউর রহমানের সময়েই পল্লীগীতি, লোকজ সংগীত , দেশাত্মবোধক গান ইত্যাদি গ্রামবাংলার সংস্কৃতিকে জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করার ফলে সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়।
বাংলা ভাষা বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্বারোপ করেন। তিনি প্রশাসন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহারকে উৎসাহিত করেন। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে জাতীয় জীবনের uk কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করতে চেয়েছিলেন। ভাষার মাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতি সংরক্ষিত হয়। তাই বাংলা ভাষার চর্চা ও প্রসার সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনগণের ধর্মীয় অনুভূতি ও নৈতিক মূল্যবোধকে সম্মান করতেন। তিনি মনে করতেন যে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিক জীবনধারা।তিনি ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও সহনশীলতার পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করেন। ধর্মীয় মূল্যবোধকে জাতীয় জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তিনি সমাজে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে যখন ভোগবাদ ও নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়, তখন নিজস্ব ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ সমাজকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে।
গণমাধ্যম একটি জাতির সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জিয়াউর রহমান গণমাধ্যমকে জাতীয় সংস্কৃতি প্রচারের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন।তাঁর সময়ে রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতি, সংগীত, সাহিত্য ও ঐতিহ্যভিত্তিক অনুষ্ঠান সম্প্রচারে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে জনগণের মধ্যে জাতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।বিটিভি-তে জাতীয় পর্যায়ের শিশু-কিশোর প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা হিসেবে “নতুন কুঁড়ি” অনুষ্ঠানটি জিয়াউর রহমানের শাসন আমলে ব্যাপক বিস্তার ও প্রচার হয়।দেশীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা তাঁদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ লাভ করেন। গণমাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতির উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশি সাংস্কৃতিক প্রভাবের একচেটিয়া আধিপত্য কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির মূল শিকড় গ্রামে প্রোথিত। জিয়াউর রহমান গ্রামীণ উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্বও উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি তাঁদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে।গ্রামীণ মেলা, লোকসংগীত, পালাগান, যাত্রা, বাউলগান , জারি গান, পল্লীগীতি ও অন্যান্য লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি নতুন আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এর ফলে দেশীয় সংস্কৃতির ভিত্তি আরও মজবুত হয় এবং বিদেশি সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিপরীতে একটি স্বকীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে ওঠে।
জিয়াউর রহমান শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরেন। বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তিনি বিশ্বের কাছে দেশের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতি বৃদ্ধি পায়।একটি দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় যত বেশি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তত শক্তিশালী হয়।জিয়াউর রহমান কখনোই বিশ্বের অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পক্ষে ছিলেন না। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন যে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে তা যেন জাতীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। অর্থাৎ তিনি সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাউথ এশিয়ান এসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশন (SAARC) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। সার্ক গঠনের ধারণাটি প্রথম উত্থাপন করেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর উদ্যোগে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি আঞ্চলিক সংস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়।সার্কের লক্ষ্য শুধু বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়; সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিল্পকলা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও প্রাসঙ্গিক। বিশ্বায়নের যুগে অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেও নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব—এই ধারণার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতিতে।
উপসংহারে স্পষ্টভাবে বলা যায় যে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং দেশপ্রেমকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা, দেশীয় সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা, বাংলা ভাষার বিকাশ, গ্রামীণ সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ, গণমাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতির প্রসার এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা তাঁর অবদানের উল্লেখযোগ্য দিক। তাঁর এসব উদ্যোগ জাতীয় সংস্কৃতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের নতুন নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাংস্কৃতিক চিন্তাধারা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
লেখক- ফেলো, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ এবং যুগ্ম আহ্বায়ক, জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটি

