রবিবার

৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মানিকগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ পাঁচ জয়িতার গল্প

🕙 প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল, ২০২৬ । ৬:৩৬ পূর্বাহ্ণ

অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার মানিকনগর গ্রামের মৃত কাশেম বিশ্বাস ও লাইলী বেগমের মেয়ে স্বপ্না বেগম অর্থনৈকিভাবে সাফল্য অর্জনকারী এক নারী। দিনমজুর পরিবারে জন্ম নেয়া ২ বোন এক ভাইয়ের মধ্যে স্বপ্না বড়। অভাব অনটনের মধ্যে বেড়ে ওঠা স্বপ্নার প্রাথমিকের গন্ডি পেরোতেই বিয়ে হয় ভূমিহীন যুবক নূর আলমের সঙ্গে। স্বামী অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে কোনমতে সংসার চালায়। এভাবে কয়েক বছর পার হয়ে যায়। এরই মধ্যে ২ ছেলে ও ২ মেয়ের জন্ম হয়। সংসারে অভাবের তাড়নায় স্বচ্ছলতা আনতে বড় স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ পাড়ি দেয় স্বপ্না। বিদেশ যাওয়ার কিছুদিন পর দূর্ঘটনায় স্বামীর হাত ও বড় ছেলের পা ভেঙ্গে যায়। তাদের চিকিৎসা বাবদ অর্জিত সব টাকা খরচ হয়ে যায়। স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় স্বপ্নার। খালি হাত দেশে ফিরে আসে। অসহায় স্বামী কাজ করতে পারে না। হাল ধরতে একটি এনজিও থেকে উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষন নেয় স্বপ্না। অন্যের বাড়িতে দিন মুজুরের কাজ করে কিছু টাকা সঞ্চয় করে। সাথে কিছু টাকা ধার করে চানাচুর, নিমকি, গজা বানিয়ে বিক্রি করা শুরু করে। অল্পদিনেই খাবারের চাহিদা বাড়তে থাকে। পরে প্রবাসী কল্যান ব্যাংক থেকে ১ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসার পরিধি বড় করে। তার স্বামী তৈরিকৃত খাবার বাজারে বিক্রয় শুরু করে। পাইকারিতে খাবার বিক্রি শুরু হয়। দুইজন মহিলাকে নিয়োগ দিয়ে ব্যবসা বড় করা হয়। মাসিক আয় দাঁড়ায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। কিছুদিনের মধ্যে জমি কিনে ধান চাষ শুরু করেন। পাশাপাশি গরু ও ছাগলের খামার দেয়ার পরিরকল্পনা করছেন। বর্তমানে ২ মেয়ে ২ ছেলে ও স্বামীকে নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী
কাবেরী সুলতানা শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী। তার জন্ম স্বল্প আয়ের এক কৃষক পরিবারে। বাবা কৃষিকাজ করতেন, মা সেলাই করে সংসার চালাতে সাহায্য করতেন। শারিরীক প্রতিবন্ধী হওয়ায় বিদ্যালয়ে ভর্তিতে অস্বীকৃতি জানায় কর্তৃপক্ষ। পরিবারের দৃঢ় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত ভর্তি করা সম্ভব হয়। শিক্ষা জীবনে অর্থনৈতিক সংকট ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্কুল-কলেজ অতিক্রম করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। গ্রাজুয়েশন শেষে একটি এনজিওতে কাজ শুরু করেন। কিন্তু প্রতিবন্ধী-বান্ধব পরিবহন না থাকায় প্রতিদিন অফিস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। বাধা সত্ত্বেও আমি এক্সেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন থেকে ইন্টার্নশিপ সফলভাবে শেষ করে প্রতিষ্ঠানে ছয় মাস কাজ করে। পাশাপাশি মানিকগঞ্জ জেলার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন এমডিপিওডি’র চেয়ারপারসন হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন, অধিকার ও অন্তর্ভুক্তি বিষয়ক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন।চাকরি জীবনে ব্যক্তিগত পরিচর্যা, গৃহস্থালি কাজ এবং অপ্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে হয়। কিন্তু কখনো থামেনি। দৃঢ়তা, শেখার আগ্রহ এবং কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। শিক্ষা থেকে শুরু করে চাকরি এবং নেতৃত্বের প্রতিটি পর্যায়ে অর্জন প্রমাণ করে যে সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধী নারীরাও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। #

সফল জননী নারী
আলেয়া বেগম একজন সফল জননী নারী। দাদা ছিলেন মাসজিদের ইমাম। রক্ষনশীল পরিবারের সদস্য হিসেবে ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়। ছোট বয়সে স্কুল ছেড়ে সংসার জীবন শুরু। ১৯৭৪ সনে স্বামী ঢাকায় কলেজে ভর্তি হলেও সংসারের চাপে টাইপ শিখে চাকুরীতে যোগদান করেন। পর্যায়ক্রমে দুই সন্তানের মা হন। সন্তানের লেখাপড়ার জন্য মানিকগঞ্জ শহরে চলে আসেন। ছেলেকে মানিকগঞ্জ মডেল হাই স্কুলে এবং মেয়েকে এস কে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণীতে ভর্তি করেন। গ্রামের কিছু জমি বিক্রি করে মানিকগঞ্জ শহরে ৬ শতক জমি কিনে ছোট একটি টিনের ঘর তুলে বসবাস শুরু করেন। হাঁস মুরগী পালন সহ কলা পেপে ও শাক সবজী রোপণ করেন। নিজের চাহিদা সহ কিছু শাক সবজী বিক্রয় করেন। স্বামীর সংসারে সহযোগীতা সহ ছেলে মেয়ের প্রাইভেট ও খাতা কলমের যোগান দিতেন। ১৯৯৮ সনে ছেলে এমবিবিএস এ চান্স পায় এবং মেয়ে জুনিয়র বৃত্তি পায়। মেয়ে এসএসসি ও এইচ এসসি তে স্টার মার্কস্ পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে লেখাপড়া শুরু করে। দুই জন সন্তানের পড়ার খরচ চালাতে স্বামী বাসায় কম্পিউটার যোগার করে উকিল সাহেবদের টাইপ এর কাজ করতেন। হাঁস মুরগী শাক-সবজী সহ একটি সেলাই মেশিন যোগার করে প্রতিবেশীদের জামা-কাপড় তৈরি করতেন। বর্তমানে ছেলে-মেয়ে কেডার সার্ভিসে যোগদান করলে পরিশ্রম সার্থক হয়।

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী
স্বপ্না রাজবংশী, ডিগ্রীতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয় নারায়ন মন্ডলের সাথে। বিয়ের এক বছর পর স্বামীর সরকারি চাকুরি হয়। এরপর থেকে শশুরবাড়িতে নির্যাতন শুরু হয়। পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়া হয়। বাবার বাড়ি থেকে মোটরসাইকেল, মোটা অংকের টাকা পয়সা আনার জন্য চাপ দেয়া হয়। বাবার সামর্থ না থাকায় চাহিদা পূরণ করতে পারে নাই। স্বামী অত্যাচার শুরু করে। এভাবে বেশ কিছু দিন পর বাবার বাড়ি ফেলে চলে যায়। স্বামী ও শশুরবাড়ির লোকজন আর কোন যোগাযোগ রাখে নাই। স্বামীর বাড়িতে গেলে তাড়িয়ে দেয়। অনেক কষ্টে বাবার বাড়িতে আবার পড়াশুনা শুরু করে ডিগ্রী পাস করে মাস্টাস ভর্তি হন। বর্তমানে বেসরকারি একটি ফার্মে চাকুরি করছেন।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী
লাভলী ইয়াসমীন রুমী সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন। পিতা- নুরুল ইসলাম সরকারী চাকুরিজীবি ও মা বেগম শামসুন্নাহার একজন শিক্ষক ছিলেন। ৯ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। এস.এস.সি পাশের পর বিয়ে হয়। স্বামী- গোলাম মহিয়ার খান সিপার একজন মুক্তিযোদ্ধা জেলা কমান্ডার ছিলেন। দুই ছেলে সন্তানের জননী। স্বপ্ন ছিল স্বামীর আয়ের উপর সংসার চলবে কিন্তু তা হয়নি। টিউশনি করে লেখাপড়াটা শুরু করেন। এইচ.এস.সি পাশের পর “আশা” এন.জি.ও তে চাকুরী করেন। ডিগ্রি পাশ করে আফরোজা রমজান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর ঘিওর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৮৮ সালে শিক্ষকতায় যোগ দেন। চাকুরীরত অবস্থায় বি.এড এবং এম.এ (ইতিহাস) পাশ করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি মানুষের জন্য কাজ করেন। গরিব ছাত্রীদের পড়াশোনা চালানোর জন্য সেলাই, হাঁস-মুরগি পালন, বৃক্ষরোপনসহ বিভিন্ন কাজে উৎসাহিত করেন।
মহিলা পরিষদ, মহিলা সংস্থা, গার্ল গাইডস্ এর মতো বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামুলক সংগঠনে জড়িত হয়ে সামাজিক সেবা শুরু করেন। ২০০৭ সাল থেকে দৈনিক অনুনাদ পত্রিকার প্রকাশক এবং সম্পাদক এর দায়িত্ব পালন করছেন।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ