জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ও আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এক বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা তাপজনিত কারণে বছরে গড়ে প্রায় ২৪ কর্মদিবস হারাতে পারেন।
‘হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং—আ কল ফর অ্যাকশন’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জার্মানিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল।
রোববার (১৯ জুলাই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে জলবায়ুজনিত চরম তাপপ্রবাহের সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের ব্যাপকতা, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের উচ্চ হার এবং সীমিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে এ ঝুঁকি আরও বেশি।
বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আটটি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহ একদিকে মানুষের কর্মক্ষমতা ও আয় কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে জীবনযাত্রা ও চিকিৎসা ব্যয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে কৃষি ও নির্মাণ খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে সব খাত মিলিয়ে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। কারণ তাদের অধিকাংশেরই অসুস্থতাজনিত ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা কিংবা আয় সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ জনগণকে নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয়েছে, যা গবেষণাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এছাড়া ২০০০ সালের তুলনায় মাথাপিছু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় ৮৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তাপজনিত অসুস্থতা বাড়লে সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।
গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে পারে। এ সময় আর্দ্রতার কারণে তাপ-ঝুঁকিও উচ্চ থেকে অতি-উচ্চ পর্যায়ে থাকবে। তীব্র তাপপ্রবাহের সময় কিছু খাতে উৎপাদনশীলতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে ল্যানসেটের একটি সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে চরম তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশে আনুমানিক ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের শ্রম আয় ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
এছাড়া তাপপ্রবাহের সময় ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাট শ্রমিক, কারখানা কর্মী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় জলবায়ু অভিযোজন, জনস্বাস্থ্য ও শ্রমনীতি সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, তাপপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় তাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্বাস্থ্য ও শ্রমিক সুরক্ষায় জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

