হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা চরমে, ইরানে নতুন করে মার্কিন বিমান হামলা

🕙 প্রকাশিত : ১৩ জুলাই, ২০২৬ । ৬:২৬ এএম

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের বিভিন্ন স্থানে নতুন দফায় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান অভিযোগ করেছে, এই সামরিক পদক্ষেপের ফলে গত কয়েক মাসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কার্যত ভেস্তে গেছে এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি নতুন সংকটের মুখে পড়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও অসামরিক নাবিকদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং ইরানি বাহিনীর আক্রমণ সক্ষমতা কমিয়ে আনতেই রোববার (১২ জুলাই) গ্রিনিচ মান সময় রাত ৯টা থেকে নতুন করে বিমান হামলা শুরু করা হয়েছে।

সেন্টকমের দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। হামলার বিষয়ে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা আকাশে ইরানের চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।

কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনীও জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় শত্রুভাবাপন্ন উড়ন্ত বস্তু শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের হামলা ও পাল্টা হামলার মাত্রা এবং পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এর আগে শনিবার রাতে মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। সেন্টকমের দাবি, চলতি সপ্তাহে তিন রাতের অভিযানে ইরানের ৩০০টিরও বেশি সামরিক অবস্থানে আঘাত হানা হয়েছে।

এই নতুন সংঘাতের ফলে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে চলাচল অব্যাহত রেখেছে।

এর আগে রোববার ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। কাতার, যা শান্তি আলোচনায় অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে কাজ করছে, সেখানে গত এপ্রিলের পর এই প্রথম হামলার ঘটনা ঘটল।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, মে মাসের পর এই প্রথম তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইরানি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।

ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী বন্দর নগরী সিরিক, বন্দর আব্বাস এবং কুশেম দ্বীপে মার্কিন হামলার ফলে ব্যাপক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এই পদক্ষেপ পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কমানো ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তেহরানের অভিযোগ, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের ইরানের প্রচেষ্টায় হস্তক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

ইরানের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি ও নৌপথ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের মাস্কাটে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনা কোনো ফলাফল ছাড়াই শেষ হয়েছে।

গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করলেও আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দেন। অন্যদিকে ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এক বিবৃতিতে বলেন, একতরফা চুক্তির যুগ শেষ হয়ে গেছে এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে তার মূল্য দিতে হবে।

চলমান এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা আরও বেড়েছে। সোমবার টোকিও বাজারে লেনদেন শুরুর পর অপরিশোধিত তেলের দাম সাড়ে তিন শতাংশের বেশি বেড়ে যায় এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৪ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে শুল্ক আদায়ের একটি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে এবং অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ চলাচল না করার সতর্কবার্তা দিয়েছে।

এদিকে ইরানের নবগঠিত পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক তৎপরতার কারণে বর্তমানে এই জলপথে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নতুন করে পারমিট দেওয়া হবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তাদের নৌবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে এবং ওমানের উপকূলঘেঁষা বিকল্প দক্ষিণ রুট দিয়ে এখনো জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ