বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং এটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তব সংকটে পরিণত হয়েছে। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২৭ দশমিক ৩৫ পিপিএমে। বিজ্ঞানীরা বহু আগেই ৪০০ পিপিএমকে বিপজ্জনক সীমা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, যা অতিক্রম করা হয় ২০১৫ সালেই। এর সঙ্গে অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুমণ্ডলে জমে থাকা মোট গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রায় ৮০ শতাংশই কার্বন ডাই-অক্সাইড। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর এবং চলতি বছরেও নতুন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে ইউরোপ, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, ভয়াবহ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, দাবানল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগের মাত্রা বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ১৫০টির বেশি নজিরবিহীন জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক সংকটের গভীরতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দরিদ্র ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষ। খাদ্যনিরাপত্তা, বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান ও জীবিকার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রবীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে রোগব্যাধি, মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ অভিঘাতের মুখোমুখি। ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল, অসংখ্য নদ-নদী এবং উচ্চ জনঘনত্বের কারণে দেশটি বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা ও তাপপ্রবাহের ঘটনা বেড়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, যা কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও সুপেয় পানির উৎসকে হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সুন্দরবনসহ দেশের বনভূমি ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও মানবিক নিরাপত্তার ওপরও বাড়ছে চাপ। শুধু বাংলাদেশ নয়, মালদ্বীপ, টুভালু ও কিরিবাতির মতো ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো ভবিষ্যতে সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার নিয়েও দেখা দিয়েছে হতাশা। বিভিন্ন জলবায়ু সম্মেলনে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে নিঃসরণ কমছে না, বরং বাড়ছেই। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার পাশাপাশি দ্রুত বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানো ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের বিকল্প নেই।
জাতিসংঘের আন্তঃরাষ্ট্রীয় জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেলের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০১৯ সালের তুলনায় ৪৩ শতাংশ কমাতে হবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৬০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৮৪ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, বিশ্ব এখনো সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্য সংকট ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। তাই এখনই কার্যকর বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণ না করলে জলবায়ু সংকট মানবসভ্যতার জন্য এক গভীর মহাবিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।


