চীনের নজরে বাংলাদেশের কাঁঠাল, রপ্তানিতে খুলতে পারে নতুন সম্ভাবনা

🕙 প্রকাশিত : ২৮ জুন, ২০২৬ । ৫:০৯ এএম

বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানিতে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে কাঁঠাল বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত বছর চীন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে কাঁচা আম আমদানি শুরু করার সময়ই কাঁঠাল ও পেয়ারাসহ অন্যান্য ফল আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। এবার আনুষ্ঠানিক সমঝোতার মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া আরও এগিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অবকাঠামো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর মধ্যে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়টিও রয়েছে। তিনি বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়টি সফরে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষিনির্ভর দেশ হলেও বাংলাদেশ এখনো কৃষিপণ্য রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। চীনের মতো বড় বাজারে কাঁঠাল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে তা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির বড় অংশ এখনো ‘এথনিক মার্কেট’-নির্ভর। পণ্যের মান ধরে রাখতে না পারায় ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশও সীমিত রয়েছে।

বিশ্ববাজারে কাঁঠালের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ২০১২ সালে বৈশ্বিক কাঁঠাল বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ৩৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন ও ইকুয়েডর এই বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে ভিয়েতনাম একাই প্রায় ২৫ শতাংশ বাজার দখল করে আছে।

চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঁঠাল আমদানিকারক দেশ। তারা মূলত ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে এই ফল আমদানি করে থাকে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে অন্যতম শীর্ষ দেশ হলেও বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারে দেশের অংশগ্রহণ মাত্র ০.৩ শতাংশ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কাঁঠাল রপ্তানির বেশিরভাগই যুক্তরাজ্যে যায়। এছাড়া ইতালি, কানাডা ও ফ্রান্সেও সীমিত পরিসরে রপ্তানি হয়। ফলে চীনের বাজার বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদিত কাঁঠালের ৪৫ শতাংশের বেশি নষ্ট হয়ে যায়।

ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম জানান, দেশে উৎপাদিত ফলের মধ্যে আমের পরেই কাঁঠালের অবস্থান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং এ পর্যন্ত ছয়টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।

তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক প্যাকেজিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-বেজড প্রোডাক্ট প্রডিউসারস অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, কাঁঠাল সংরক্ষণ ও পরিবহনে ঝুঁকি রয়েছে। চীন কীভাবে এ পণ্য গ্রহণ করবে, তা নিয়ে এখনো বিস্তারিত প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, চীনের সঙ্গে এই সমঝোতা শুধু রপ্তানি বাড়াতেই নয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন এবং স্থানীয় বাজার উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ