শিরোনাম
Advertisement
সারাদেশ

*শিক্ষার্থী কমেছে, বেড়েছে ব্যয় *ভাউচারে জুতা-ড্রেসের খরচ, শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র *চুল ন্যাড়া করে দেওয়া ও মারধরের অভিযোগ *শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ

মানিকগঞ্জ/ যাকাতের টাকা যাচ্ছে কোথায়?

Advertisement
এআই ছবি

আরও পড়ুন

সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্টের (সিজেডএম) অর্থায়নে পরিচালিত মানিকগঞ্জের আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্য গ্রানাডা একাডেমিতে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা অর্থে আত্মসাৎতের অভিযোগ উঠেছে । প্রতিষ্ঠানটির অডিট প্রতিবেদনে বিভিন্ন অসংগতির তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের ব্যয়ের হিসাব এবং বাস্তবে তাদের দেওয়া সুযোগ-সুবিধার মধ্যে অসংগতি থাকার অভিযোগও উঠেছে।

অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ হেমায়েত ফেরদৌসের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, দুর্ব্যবহার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে দ্য গ্রানাডা একাডেমিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৮০ জন। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৬৫ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে ১৫ জন।

তবে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যয় ছিল ২ কোটি ৬৭ লাখ ১৩ হাজার ৭৯৩ টাকা। ২০২৫ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমলেও ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৮৭ লাখ ৮৩ হাজার ৯০২ টাকায়। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ২০ লাখ ৭০ হাজার ১০৯ টাকা।

শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার পরও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ কী, কোন কোন খাতে এই অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং বরাদ্দের অর্থ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

কয়েকজন শিক্ষার্থীর মাসিক ব্যয়ের ভাউচারে প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য এক জোড়া জুতা ও একটি স্কুল ড্রেসের খরচ দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে অফিস ফি, খাবার খরচ ও টিউশন ফির মতো খাতে শিক্ষার্থীপ্রতি ১২ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে বছরে পাওয়া জুতা, স্কুল ড্রেস ও অন্যান্য সামগ্রীর পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।

রংপুরের বাসিন্দা ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেরাব জানায়, বছরে তাদের এক জোড়া জুতা ও দুটি স্কুল ড্রেস দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ তার।

একই শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. জুংকার নাইম জানায়, তাকে একটি স্কুল ড্রেস ও এক জোড়া জুতা দেওয়া হয়েছে। বিছানার চাদর কবে দেওয়া হয়েছিল, তা তার মনে নেই।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অধ্যক্ষ হেমায়েত ফেরদৌস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁর আচরণে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। তাঁর ভয়ে একাধিক শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গেছে বলেও দাবি তাদের। এ ছাড়া অধ্যক্ষের আচরণের কারণে অভিভাবকদের কেউ কেউ সন্তানদের এই প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইনান জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসে কেনাকাটার জন্য বাইরে যাওয়ায় অধ্যক্ষ তার চুল ন্যাড়া করে দেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের নিয়েও বকাঝকা করা হয় বলে অভিযোগ তার।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেরাবের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের ওয়াশরুম ব্যবহারে সমস্যা থাকায় কখনো কখনো শ্রেণিকক্ষে ফিরতে দেরি হয়। এমন এক ঘটনায় দেরি করে ক্লাসে ফেরার কারণে অধ্যক্ষ তার চুল ধরে ঘাড়ে থাপ্পড় মারেন।

বাগেরহাট জেলার বাসিন্দা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. রাকিব হোসেনের অভিযোগ, নামাজের জামাতে অংশ নিতে না পারায় মসজিদের ভেতরেই অধ্যক্ষ তাকে মুখে ও পিঠে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। অন্য শিক্ষার্থীরাও ঘটনাটি দেখেছেন বলে দাবি তার।

রাকিবের ভাষ্য, অধ্যক্ষের ভয়ে অনেক শিক্ষার্থী ভয়ে থাকে এবং তাঁর আচরণের কারণে কেউ কেউ প্রতিষ্ঠান ছেড়েও গেছে।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার এবং চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি পুলিশের ভয় দেখিয়ে এক শিক্ষকের কাছ থেকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় ওই শিক্ষক মানিকগঞ্জ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে জানা গেছে।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উত্থাপিত অভিযোগ এবং অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে দ্য গ্রানাডা একাডেমির অধ্যক্ষ হেমায়েত ফেরদৌস বলেন, “কয়েকজন শিক্ষক আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। তারাই শিক্ষার্থীদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করাচ্ছেন। অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি নিয়মিত অডিট হয়। বরাদ্দের অর্থ নয়-ছয় করার সুযোগ নেই। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই ভিত্তিহীন।”

সিজেডএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মিয়া আইয়ুব বলেন, “এই অভিযোগগুলো আমার পেয়েছি।পরে এই বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তারা সম্ভবত চেয়ারম্যান স্যারের কাছে একটি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। আর এই প্রতিষ্ঠানটি চলে যাকাতের টাকায়। এই টাকা আত্মসাৎ বা জমা রাখার কোন সুযোগ নেই।”

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোঃ খায়রুল ইসলাম, “এই অভিযোগের বিষয়ে আমরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে দেখবো। যদি সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ বিভাগের আরও সংবাদ