মোবাইল ফোন হাতে ভিডিও ধারণ, এরপর যাচাই-বাছাই ছাড়াই ফেসবুক-ইউটিউবে প্রচার। কখনো ধর্ষণের শিকার নারীর পরিচয় প্রকাশ, কখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা, আবার কখনো মৃত্যুর ঘটনাকে নিশ্চিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন। এসব কনটেন্ট ঘিরে ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি, তৈরি হচ্ছে উত্তেজনা। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবার, পুলিশ ও মূলধারার সাংবাদিকদের।
মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে, ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যাচ্ছে কি সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা?
সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম অভিযোগ করেন, কিছু কনটেন্ট নির্মাতা ভিউ বাড়ানোর জন্য দায়িত্বহীনভাবে তথ্য প্রচার করছেন। তাঁর ভাষায়, “এরা অপসাংবাদিকতা করে থাকে। ভিউ বাড়ানোর জন্য এমন জঘন্য কাজ করেছে। এরা মোটেও সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা জানেন না।” বিশেষ করে মারিয়া মাহির মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে প্রচারিত তথ্য নিয়ে পুলিশ বিব্রত হয়েছে বলে জানান তিনি। সিংগাইরের তিনটি ঘটনা নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান ওসি।
ঘটনা-০১ : গণধর্ষণের শিকার নারীর পরিচয় প্রকাশের অভিযোগ :
মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ২৩ বছর বয়সী এক নারীকে গণধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে সকলেই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে তদন্ত কর্মকর্তা সিংগের থানার পুলিশ পরিদর্শক রেজাউল করিম পিপিএম জানিয়েছেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে বলধারা ইউনিয়নে ওই নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি নিজে বাদী হয়ে সিংগাইর থানায় মামলা করেন।
এ ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজন ইউটিউবার ও কনটেন্ট নির্মাতা ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করে ভিডিও প্রচার করেছেন। তাঁর আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সাক্ষাৎকারও পরিচয় প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পরিবারটি সামাজিক ও পারিবারিক সংকটে পড়েছে। সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ তাঁর নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের ঘটনায় সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে পরিচয় গোপন রাখা এবং ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি।
ঘটনা ০২ : আহত যুবককে মৃত ঘোষণার প্রচার, বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগ :
সিংগাইরের ধল্লা ইউনিয়নে শহিদুল ইসলাম (২২) নামের এক যুবককে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়েছে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে পূর্ববিরোধের জেরে একদল ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায়। এতে তাঁর মাথা, বুক, মুখমণ্ডল ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, শহিদুল চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় কয়েকজন কনটেন্ট নির্মাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে মৃত ঘোষণা করে খবর প্রচার করেন। এরপর আহতের স্বজনেরা অভিযুক্তদের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাল্টা মামলাও হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঘটনা ০৩ : মারিয়া মাহির মৃত্যু নিয়ে হত্যা ও আত্মহত্যার বিতর্ক:
সিংগাইরের সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া মাহির (১৪) মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি ছড়িয়েছে। গত ১৫ জুন বিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। ছয় দিন পর ২১ জুন চন্দননগর এলাকার একটি কবরস্থানসংলগ্ন ঝোপে গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার মা হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক, সংবাদকর্মী ও শিক্ষার্থীসহ মোট নয়জন গ্রেপ্তার হন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন কনটেন্টে মারিয়ার মৃত্যুকে শুরু থেকেই নিশ্চিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রচার করা হয়। মরদেহে অ্যাসিড নিক্ষেপ ও গোপনাঙ্গে রড ঢোকানোর মতো গুরুতর দাবিও প্রচারিত হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য। এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পুলিশের হাতে আসার পর আত্মহত্যার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ওসি মো. মাজহারুল ইসলামও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন। তবে মারিয়ার পরিবার শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ করে আসছে। ইতিমধ্যে মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামিরা সকলেই জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এবং তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও থানা ঘেরাওসহ আঞ্চলিক মমহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্য পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে ভূমিকা এমন ভূমিকা পালন পড়ছে বলে বিজ্ঞ মহল মনে করছেন।
এদিকে স্থানীয় মূলধারার সাংবাদিকেরা অভিযোগ করে বলেন , সরকারি অনুষ্ঠান ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে পেশাগত মান যাচাই না করেই কিছু কনটেন্ট নির্মাতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সিংগাইরের এই তিনটি ঘটনা ডিজিটাল মাধ্যমে সংবাদ প্রচারের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সংবাদ পরিবেশন করাই সমস্যা নয়; মূল উদ্বেগ হলো যাচাইহীন তথ্য প্রচার, ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ এবং গুজবের মাধ্যমে জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টি। ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় একটি ভুল তথ্যও মানুষের সম্মানহানি, পারিবারিক বিপর্যয় কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ হতে পারে বলেও দাবি করেন স্থানীয় সাংবাদিকেরা।
সিংগাইর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক নয়া দিগন্ত প্রতিনিধি মো. সোহরাব হোসেন বলেন, মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করলেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যান না। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি।
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু কনটেন্ট নির্মাতা রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে প্রাধান্য পাচ্ছেন। অথচ তাঁদের প্রকাশিত যাচাইহীন ভিডিও ও পোস্টের কারণে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, যা মূলধারার সাংবাদিকদেরও বিব্রত করছে।
এ ব্যাপারে সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “এরা অপসাংবাদিকতা করে থাকে। ভিউ বাড়ানোর জন্য এমন জঘন্য কাজ করেছে। এরা মোটেও সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা জানেন না।” বিশেষ করে সাহরাইল স্কুলের শিক্ষার্থী মারিয়া মাহির মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য নিয়ে পুলিশ বিব্রত হয়েছে বলে জানান তিনি। সিংগাইরের তিনটি ঘটনা নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান ওসি।





