মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটির তড়িঘড়িতে পার পেয়েছেন পিআইও মুমিনুর রহমান।
দৌলতপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: মুমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠায় সরেজমিনে অনুসন্ধান শেষে ২০২৪ সালের ৩০ মে দৈনিক টেলিগ্রাম পত্রিকায় মানিকগঞ্জের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের দুর্নীতি পর্ব-১ ” তৃনমূলের উন্নয়ন প্রকল্প সাত ভূতে লুটপাট ” এবং ৩ জুন পর্ব-২ ” ওদের পকেট ভরে, সবার ভোগান্তি বাড়ে ” শিরোনামে দুটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদন দুটি প্রকাশের পর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্দেশে জুন মাসে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সুনির্দিষ্ট কার্য দিবস উল্লেখ না থাকায় ওই কমিটি তিন মাস পর সেপ্টেম্বর মাসের ২ তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
অনুসন্ধান বলছে, প্রতিবেদনে প্রকাশিত ইউপি সদস্যদের বক্তব্য একদিনের মধ্যে গ্রহনের মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রকাশিত প্রকল্পগুলোতে ওই কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে শুধু ” বৃষ্টিতে রাস্তা ভেঙে গেছে” মর্মে স্থানীয়দের বক্তব্য রেকর্ড করে সন্তুষ্ট হয়েছেন। এছাড়া দুই পর্বের প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও শুধুমাত্র প্রথম পর্বে যাদের বক্তব্য প্রকাশ হয়েছে তাদের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে । দ্বিতীয় পর্ব ” ওদের পকেট ভরে, সবার ভোগান্তি বাড়ে ” শিরোনাম প্রকাশিত প্রতিবেদনের কোন তদন্ত কার্যক্রম করাই হয়নি।
এ প্রতিবেদক ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত কয়েক ধাপে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে প্রতিবেদন করেন। ওই সময়ে প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্যরা পিআইওকে ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করে নানা অসঙ্গতির তথ্য প্রদান করেন। এ সময় অনেক প্রকল্প সভাপতিরা এ প্রতিবেদকের সাথে ছবিও তুলেন। তবে ওই তদন্ত প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সভাপতি ইউপি সদস্যরা এ প্রতিবেদকের সাথে কোন কথা হয়নি মর্মে বক্তব্য পেশ করেন। ফলে তদন্ত কমিটি পিআইও মুমিনুরের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেনি।
এছাড়া এ প্রতিবেদনের অনুসন্ধানকালে তথ্যের প্রয়োজনে তথ্য অধিকার আইনে পিআইও মুমিনুরের কাছে আবেদন করেন এ প্রতিবেদক। পিআইও মুমিনুর তথ্য সরবরাহ না করায় মানিকগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কার্যালয়ে আপিল করা হয়। এ আপিল কার্যালয় পিআইও মুমিনুরকে তথ্য প্রদানের নির্দেশনা দিলেও তিনি তথ্য সরবরাহ করেননি। তথ্য না পেয়ে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করেন এ প্রতিবেদক। তথ্য কমিশন উভয়পক্ষের শুনানি শেষে পিআইও মুমিনুরকে তথ্য প্রদানের নির্দেশনা দেন। তথ্য কমিশনের নির্দেশের পরেও কোন তথ্য সরবরাহ না করায় পুনরায় আবারো তথ্য কমিশনে অভিযোগ দাখিল করেন এ প্রতিবেদক। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৫ আগষ্ট এক সিদ্ধান্তপত্রে তথ্য প্রদানের সিদ্ধান্ত দেন কমিশন। ওই সময় তথ্য কমিশন তথ্য প্রদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির দায়ে পিআইও মুমিনুরকে শাস্তি প্রদান করেন।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মুমিনুর রহমান বদলি হয়ে বর্তমানে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় কর্মরত আছেন। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছেন। তদন্তে কোন অনিয়ম পাওয়া যায়নি।
সার্বিক বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, একদিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি কিভাবে প্রতিবেদন দাখিল করলো সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তদন্তের সময় ঘটা করে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করলে তো আর সত্য ঘটনা জানা সম্ভব না। তদন্ত কমিটিতে যারা ছিলেন তারা নাম পরিচয় গোপন রেখে স্থানীয় জনসাধারণ, সেই সাথে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বল্লেই ঘুষ লেনদেনসহ নানা অসঙ্গতির বয়ান পেয়ে যেতেন। প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্যরা স্বাভাবিকভাবে সরকারি আমলাদের কাছে এক প্রকার বন্দি। ফলে কেউ অনিয়মের বিষয়ে মুখ খোলেনি৷ স্থানীয় জনসাধারনও সরকারি কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের উপস্থিতিতে সাহস করে কথা বলেননি। তদন্ত কমিটিতে যারা ছিলেন তারা সঠিকভাবে প্রকল্পগুলোতে চোখ বুলালেই বুঝার কথা যে বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ হয়নি। স্বগোত্রীয় মনোভাবের কারনে আসলে এসব তদন্ত গতি পায়না।
তিনি আরো বলেন, প্রকাশিত প্রতিবেদন যদি দুই পর্বের হয়ে থাকে তাহলে দুই পর্বের প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে তদন্ত হওয়ার কথা। শুধু একটি পর্বের তদন্ত হলো বিষয়টি বোধগম্য নয়। এছাড়া গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যা প্রকাশ হয়েছে শুধু তার তদন্ত হবে বিষয়টি এমন হওয়া উচিত নয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন একটি সূত্র হতে পারে। এই সূত্রের উপর ভিত্তি করে তদন্ত কমিটি আরো গভীরভাবে তদন্ত করতে পারতেন। প্রতিবেদনে উল্লেখিত প্রকল্পগুলোর বাইরে আরো কোন গাফলতি,অসঙ্গতি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে পারতেন। তদন্ত কমিটি তড়িঘড়ি করে তদন্তের কাজ শেষ করেছেন।
সস্প্রতি বদলি হয়েছেন দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও) নাহিয়ান নুরেন। তবে তার কার্যকালীন সময়ে নানা অসঙ্গতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। একদিনের মধ্যে কিভাবে তদন্ত করলেন, প্রকল্পগুলো নথিপত্রের সাথে মিল রেখে বাস্তবায়ন করা হয়েছে কিনা, প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রথম পর্বের তদন্ত হলেও দ্বিতীয় পর্বের হয়নি কেন এমন প্রশ্ন করা হলে তদন্ত কমিটির প্রধান দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও) নাহিয়ান নুরেন বলেন, এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে জানাবেন। পরে তাকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।

