একসময় কুমোরের চাকার অবিরাম ঘূর্ণন আর পোড়া মাটির সোঁদা গন্ধে মুখর থাকত মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পালপাড়া। গ্রামীণ জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় হাঁড়ি-পাতিল, কলসি, সরা, মাটির খেলনাসহ নানা সামগ্রী তৈরিতে ব্যস্ত থাকতেন কারিগররা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আধুনিক পণ্যের প্রসার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজার সংকোচনের কারণে আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে শতবর্ষী এই মৃৎশিল্প।
সরেজমিনে দেখা যায়, পালপাড়ার বিভিন্ন বাড়ির উঠানে এখনো রোদে শুকাতে দেওয়া হয় মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, টব, শোপিস ও অন্যান্য সামগ্রী। তবে আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য আর নেই। অনেক চুলা নিভে গেছে, অনেক কারিগর পেশা পরিবর্তন করেছেন। যারা এখনো এ পেশায় আছেন, তারা ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভালো মানের কাঁচামাটি সংগ্রহ করা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত কাঠ, খড় ও তুষের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সেই তুলনায় মাটির তৈরি পণ্যের দাম বাড়েনি। ফলে অনেক কারিগর আর্থিক সংকটে পড়ে এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের মধ্যেও মৃৎশিল্পের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
তবে সব সংকটের মধ্যেও নতুন সম্ভাবনার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিক গৃহসজ্জার উপকরণ হিসেবে টেরাকোটা, মাটির টব, মগ, শোপিস ও ডিনার সেটের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক নকশা ও উৎপাদনবিষয়ক প্রশিক্ষণ, অনলাইন ও দেশব্যাপী বাজারজাতকরণের সুযোগ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে মানিকগঞ্জের পালপাড়ার মৃৎশিল্প শুধু ঐতিহ্য রক্ষা নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এই মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

