স্বজন হারানোর বেদনার চাদরে ঢাকা পড়েছিল পুরো আয়োজন

🕙 প্রকাশিত : ৪ জুলাই, ২০২৬ । ৯:০৫ এএম

জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ ও আহত যোদ্ধাদের সম্মান জানাতে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’। সন্তান ও স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে এতে অংশ নেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত আন্দোলনকারীরা। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকেই। পুরো আয়োজনজুড়েই ছিল জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনার আবেগঘন স্মৃতি।

শনিবার (৪ জুলাই) সকাল সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এ সম্মেলন শুরু হয়। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মরণ ও তাদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতেই এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চে লেখা ছিল— ‘গর্বিত ইতিহাস, অদম্য চেতনা; ৪ জুলাইয়ের এই দিনে হোক সবার অনুপ্রেরণা, যে আত্মত্যাগ ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।’

জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ স্মরণসভায় জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। শুরুতেই শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, তার ভাইয়ের আত্মত্যাগ আন্দোলনে মানুষকে রাজপথে নামতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি জুলাই স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানান।

নিহত কিশোর আলভীর বাবা আবুল হাসান বলেন, বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেও তারা প্রত্যাশিত ফল পাননি। তিনি বর্তমান সরকারের কাছে দৃশ্যমান ও সুষ্ঠু বিচার প্রত্যাশা করেন।

একইভাবে বিচারহীনতার আশঙ্কা প্রকাশ করেন শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিক আলম। তিনি বলেন, একজন সন্তানের হত্যার বিচার হলেও পরিবারগুলো কিছুটা শান্তি পাবে।

শহীদ মিরাজের বাবা আব্দুর রব মিয়া জুলাই স্মৃতিফলক সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদদের স্মৃতি অবহেলার শিকার হচ্ছে। তিনি শাপলা চত্বর ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচারও দাবি করেন।

স্মরণসভায় আবেগঘন বক্তব্য দেন শহীদ আবদুল্লাহ জামিলের মা ফাতেমা তুজ জোহরা। তিনি জানান, বড় ছেলে নিহত হওয়ার পর ছোট ছেলের ক্যানসার ধরা পড়ে এবং স্বামীও মারা যান। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে তারা পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি।

আহত আন্দোলনকারীরাও অনুষ্ঠানে নিজেদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। আহত শাহীন মালু বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে। অন্যদিকে ছাত্রদল কর্মী মিল্লাত হোসেন অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেক আহত যোদ্ধা যথাযথ চিকিৎসা ও স্বীকৃতি পাননি।

অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের পটভূমিও তুলে ধরা হয়। ২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৩৬ দিনের আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

আন্দোলনের সময় গুলি, টিয়ারশেল ও কঠোর দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করেও আন্দোলন দমন করা যায়নি। ১৬ জুলাই রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

সরকারি গেজেট অনুযায়ী জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা ৮৩৪ জন। তবে জাতিসংঘের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ