মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বনপারিল গ্রামে একইদিন সংঘটিত তিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত কিশোর নাঈমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ শনিবার দুপরে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ঘটে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। ওইদিন বিকেলে প্রতিবেশীর বাড়ির সামনে খেলছিল বনপারিল গ্রামের সৌদিপ্রাবাসী দুদল মিয়ার মেয়ে আতিকা আক্তার (৭)। কিন্তু হঠাৎ করেই আর খোঁজ মিলছিল না তার। নিখোঁজ হওয়ার পরপরই পরিবারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানানো হয় বিষয়টি। পাশাপাশি এলাকাজুড়ে মাইকিং করে খোঁজ চালানো হয় শিশুটির।
পরে সন্দেহভাজন কিশোর নাঈমকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন স্থানীয়রা। নাঈমের দেওয়া তথ্যে রাত ১০টার দিকে বাড়ির পাশের ভুট্টা ক্ষেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আতিকার মরদেহ পায় পরিবার। স্থানীয়দের ধারণা, ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে আতিকাকে হত্যা করে থাকতে পারে নাঈম।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শিশু আতিকার মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন। এই সুযোগে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় অভিযুক্ত নাঈম। পরে ওই কিশোরের বড়ভাই নাজমুলকে আটক করেন স্থানীয়রা। এরপর কিশোরের বাবা পান্নু, চাচা ফজলুকে ডেকে আনা হয় নিহত শিশুর বাড়িতে। রাত ১১টার দিকে স্থানীয় লোকজন পিটুনি দেয় পান্নু ও ফজলুকে। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তারা। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন অভিযুক্ত কিশোরের বড় ভাই নাজমুল।
খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে সদর থানা পুলিশ। এরপর নিহত আতিকা, পান্নু ও ফজলুর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। পরদিন শুক্রবার বিকেলে নিহত শিশুর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং এশার নামাজের পরে দাফন সম্পন্ন হয় তার।
এ ঘটনায় আজ শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে সদর থানায় মামলা দায়ের করেছেন নিহত শিশুর মা আরিফা আক্তার। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে কিশোর নাঈমকে। অন্য আসামিরা হলেন- পিটুনিতে নিহত মো. পান্নু মিয়া, তার ভাই ফজলু মিয়া, আহত নাজমুল হোসেন ও রনি। মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ইকরাম হোসেন।
এদিকে,তিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে বনপারিল গ্রামে। দুই পক্ষের বাড়িতেই চলছে শোকের মাতম। আতঙ্ক বিরাজ করছে স্থানীয়দের মধ্যে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) বেলা পৌনে ১১টার দিকে শিশু আতিকার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, বিলাপ করছেন তার স্বজনরা। এ ঘটনার পর ছেলে আবিরকে (১২) নিয়ে আর ওই গ্রামে থাকতে চাইছেন না নিহত আতিকার মা। মেয়ের পর ছেলেকে হারানোর আশঙ্কা তার।
আতিকার দাদি জিয়ারন বেগম (৬০) বলছিলেন, ‘ওরা (অভিযুক্ত কিশোর) আমার নাতনিকে কেন মারল? দুদিন আগেও হাসি-খুশি মুখ, বাড়ির উঠানে ছোটাছুটি করছে। আমার নাতনি আর বলবে না দাদি আমাকে সাজিয়ে দাও।’
অন্যদিকে, পিটুনিতে নিহত ইজিবাইকচালক পান্নু মিয়ার বাড়ির বসতঘরে ঝুলছে তালা। বাড়ির ওঠানের একটি বেঞ্চে বসে আছেন তার খালা ও স্বজনেরা। নিহতের স্ত্রী নারগিস আক্তার স্বামী ও দেবরের লাশ আনতে গেছেন মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। বসতঘরের সিঁড়ির একপাশেই রয়েছে ইজিবাইক।
নিহত পান্নু মিয়ার খালা রওশন আরার ভাষ্য, ‘আমার বোনপুকে (বোনের ছেলে) কেন এইভাবে পিটিয়ে মারল তারা? ছেলের অপরাধে কেন বাবা ও চাচাকে হত্যা? নাঈম অপরাধী হলে তাকে মারত, আমাদের দুঃখ-কষ্ট থাকত না। কিন্তু পান্নু ও ফজলুকে মারল কেন?’
এবিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ইকরাম হোসেন জানান,অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বিক্রি করা কানের দুল উদ্ধার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সদর থানায় মামলা করেছেন নিহত শিশুর মা আরিফা আক্তার। মামলার প্রধান অভিযুক্ত নাঈমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে গণপিটুনিতে নিহত দুই ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত অভিযোগ দায়ের করেনি কেউ। অভিযোগ পেলে আইনিব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, বলছিলেন তিনি।

