সোমবার

২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অসহনীয় গরমে বিপর্যস্ত জনজীবন

🕙 প্রকাশিত : ২৩ মে, ২০২৬ । ৬:৪৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ নতুন কিছু নয়। তবে চলতি বছরের তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক আর্দ্রতা এবং গুমোট আবহাওয়া যে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তা নিছক মৌসুমি অস্বস্তির সীমা ছাড়িয়ে এক গভীর জলবায়ু সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের কোথাও তীব্র তাপদাহ, কোথাও আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাত—প্রকৃতির এই চরম বৈপরীত্য এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রতিফলন।

আবহাওয়াবিদদের মতে, থার্মোমিটারে যে তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে মানুষের শরীরে তার চেয়েও কয়েক ডিগ্রি বেশি অনুভূত হচ্ছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও জলীয় বাষ্পের কারণে ‘ফিলস লাইক’ তাপমাত্রা জনজীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, দিনমজুর ও হকারদের জন্য এই গরম এখন নীরব দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। শিশুরা অসুস্থ হচ্ছে, বৃদ্ধদের জন্য পরিস্থিতি হয়ে উঠছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।

আমাদের নগর ব্যবস্থাপনাও এই সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বৃক্ষনিধন, জলাধার ভরাট এবং কংক্রিটনির্ভর নির্মাণশৈলীর কারণে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর ধীরে ধীরে ‘হিট আইল্যান্ডে’ পরিণত হচ্ছে। ফলে শহরের ভেতরের তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; জনস্বাস্থ্য, শ্রম উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনীতির ওপরও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর ভবিষ্যতের শঙ্কা নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। একদিকে দীর্ঘ খরা ও তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও বন্যা—প্রকৃতির এই অস্বাভাবিক আচরণ ক্রমেই ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

শহরাঞ্চলে বৃক্ষরোপণ, খাল ও জলাধার সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের জন্য ‘হিট সেফটি গাইডলাইন’ প্রণয়ন প্রয়োজন। প্রচণ্ড গরমের সময় কর্মঘণ্টা পুনর্বিন্যাস, বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ ও বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

স্বাস্থ্যখাতকেও প্রস্তুত থাকতে হবে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও গরমজনিত রোগ মোকাবিলার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অপ্রয়োজনে দুপুরের রোদ এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, শিশু ও বৃদ্ধদের প্রতি বাড়তি যত্নশীল হওয়া এবং বজ্রপাতের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা এখন জীবনরক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

তবে শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলেই চলবে না। উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরে পরিবেশ ও জলবায়ু সংবেদনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত করে কোনো উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

আজকের এই অসহনীয় গরম আমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এটিকে সাময়িক দুর্ভোগ ভেবে উপেক্ষা না করে জলবায়ু বাস্তবতার কঠিন সংকেত হিসেবে গ্রহণ করাই হবে দূরদর্শিতার পরিচয়।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ