ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হলেও দেশটির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়নি। বরং হরমুজ প্রণালিতে শক্ত অবস্থান নিয়ে ইরান এখন বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং চাপে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী বিমান হামলার পর ইরান বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা বাড়িয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতা নিয়ে গর্ব করা উপসাগরীয় দেশগুলো এখন অস্থির পরিস্থিতির মুখোমুখি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রথম দিন তেহরানের আকাশে কালো ধোঁয়া দেখা যাওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। কয়েক বছরের গোয়েন্দা তৎপরতা ও পরিকল্পনার পর তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়ে খামেনিসহ ডজনখানেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। এতে ইরানের সরকার কিছু সময়ের জন্য নেতৃত্ব সংকটে পড়লেও দ্রুতই নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিকেন্দ্রীকৃত ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ কৌশলের কারণে শীর্ষ নেতৃত্ব হারালেও দেশটির সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, কিছু সিনিয়র নেতাকে হারালেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে এবং তারা তিন স্তরের কৌশল গ্রহণ করেছে—টিকে থাকা, পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা বজায় রাখা এবং যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা।
এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী ট্যাঙ্কার এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার মতো দেশে জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছু স্থানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচল ও পণ্য পরিবহনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ বাড়ছে। অনেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও নিজেদের আসন হারানোর আশঙ্কা করছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ইরানও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে পারে। গবেষকদের মতে, দেশটি ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে যেখানে সরকার টিকে থাকলেও অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প হয়তো ‘বিজয়’-এর সংজ্ঞা পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারেন এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে সরে এসে খামেনিকে হত্যা করাকেই বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইরান সহজে যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাত থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের প্রভাব আরও দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

