জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সংকট: হিমালয়ে মানুষ ও চিতাবাঘের সংঘাত বাড়ছে

শহিদুল ইসলাম সুজনসম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক টেলিগ্রাম
🕙 প্রকাশিত : ২ আগস্ট, ২০২৬ । ১:৫৬ পিএম

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল ও খাদ্যচক্রও বদলে যাচ্ছে। এর ফল হিসেবে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। হিমালয় অঞ্চলে চিতাবাঘ ও মানুষের বাড়তে থাকা মুখোমুখি সংঘর্ষ সেই বাস্তবতারই একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর উপকণ্ঠে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক প্রবীণ কৃষকের ওপর চিতাবাঘের আকস্মিক হামলার ঘটনা জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। পরে বন বিভাগের কর্মীরা দীর্ঘ চেষ্টার পর প্রাণীটিকে উদ্ধার করলেও ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, বন্যপ্রাণী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের বসতির কাছাকাছি চলে আসছে।

সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নেপালে হাতি, গন্ডার, বাঘ এবং সাধারণ চিতাবাঘের সঙ্গে সংঘাতে ৮৮৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছে ১,১৩৯টি বন্যপ্রাণী। এর মধ্যে সাধারণ চিতাবাঘই প্রতি বছর গড়ে ১৯ জন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী, যা অন্য বড় শিকারি প্রাণীর তুলনায় বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত তিন দশকে নেপালের বনভূমি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বন সম্প্রসারণ বন্যপ্রাণীর জন্য ইতিবাচক হলেও তাদের প্রাকৃতিক খাদ্যের ঘাটতি এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান অনুপ্রবেশ চিতাবাঘকে জনবসতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক অঞ্চলে চিতাবাঘের খাদ্যতালিকায় গৃহপালিত পশুর অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।

এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে আগে যেখানে চিতাবাঘের বসবাস সীমিত ছিল, এখন সেই উঁচু পার্বত্য এলাকাগুলোও তাদের জন্য উপযোগী হয়ে উঠছে। ফলে নতুন নতুন জনবসতিতে তাদের প্রবেশের ঘটনা বাড়ছে। পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, নতুন সড়ক নির্মাণ, বনাঞ্চলে মানুষের বিস্তার এবং অবৈধ শিকারও বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল ও আবাসস্থলকে ব্যাহত করছে।

এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্ভাবনী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোথাও গবাদিপশুর সুরক্ষায় বিশেষ ধরনের প্রতিরক্ষামূলক কলার ব্যবহার করা হচ্ছে, কোথাও সৌরশক্তিচালিত এলইডি আলো দিয়ে বন্যপ্রাণীকে দূরে রাখা হচ্ছে। আবার কোথাও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ক্যামেরা কিংবা স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে যৌথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংঘাত কমানোর চেষ্টা চলছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু ক্ষতিপূরণ প্রদান করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। নিরাপদ পশুপালন ব্যবস্থা, শক্তিশালী সুরক্ষা অবকাঠামো, দ্রুত আর্থিক সহায়তা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বন সংরক্ষণ ও মানবনিরাপত্তার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য গড়ে তোলাও জরুরি।

প্রকৃতি সংরক্ষণ অবশ্যই মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। তবে সেই সংরক্ষণ যদি মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকার সঙ্গে সমন্বয় না রেখে পরিচালিত হয়, তাহলে তা নতুন সামাজিক ও পরিবেশগত সংকট সৃষ্টি করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতায় মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ