বাংলাদেশে সিন্থেটিক মাদক ইয়াবার বিস্তার জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর আইন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান সত্ত্বেও ইয়াবার ব্যবহার কমানো সম্ভব হচ্ছে না। বরং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি, আর্থসামাজিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের কারণে এই মাদকের বিস্তার আরও জটিল আকার ধারণ করছে।
থাই শব্দ ‘ইয়াবা’র অর্থ ‘পাগল করা ওষুধ’। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই সিন্থেটিক মাদক বর্তমানে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষকে আসক্তির ঝুঁকিতে ফেলছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশ কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত। বিশেষ করে সিন্থেটিক ও আধা-সিন্থেটিক মাদকের সহজলভ্যতা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণে চলতি মাসে জাতীয় সংসদে মাদক-সংশ্লিষ্ট গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিল অনুমোদন করা হয়েছে। বাংলাদেশে ইয়াবাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘ক-শ্রেণির’ (ক্লাস-এ) মাদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এর আগে ২০১৮ সালে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। সে সময় বহু মানুষ নিহত ও গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কঠোর অভিযান নয়, আসক্তি প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও সামাজিক উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আরিফুজ্জামান জানান, দেশে বর্তমানে মাত্র প্রায় ৩৫০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। ফলে সরকারি হাসপাতালে একজন চিকিৎসককে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগী দেখতে হয়। পাশাপাশি দক্ষ মনোবিজ্ঞানীরও তীব্র সংকট রয়েছে। ২০১৮-১৯ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন এমন প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই সেবার বাইরে রয়েছেন।
চিকিৎসকদের মতে, ইয়াবার পাশাপাশি হেরোইন, বুপ্রেনোরফিন ইনজেকশন ও ওমোরফোন বড়ির ব্যবহারও বাড়ছে। বিষণ্নতা, মানসিক চাপ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা ব্যক্তিগত সংকট থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই মাদকের দিকে ঝুঁকছেন। অনেক আসক্ত পরবর্তীতে মাদকের ব্যয় মেটাতে অবৈধ কারবারেও জড়িয়ে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্ক ইয়াবা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ড, লাওস ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ অঞ্চল বর্তমানে সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশে প্রবেশ করা অধিকাংশ ইয়াবার উৎস হিসেবেও মিয়ানমারকে চিহ্নিত করা হয়।
মাদকাসক্ত এক ব্যক্তির অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে ইয়াবার ভয়াবহ প্রভাব। তাঁর ভাষায়, শুরুতে অনেকেই সিগারেট বা গাঁজা দিয়ে শুরু করলেও পরে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েন। নিয়মিত ইয়াবা সেবনে অনিদ্রা, খিঁচুনি, স্ট্রোক, মানসিক ভারসাম্যহীনতা এবং শারীরিক অবক্ষয়ের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাঁর দাবি, এই মাদক মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা ও আচরণকে ধ্বংস করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধানে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সহায়তা এবং সীমান্তে মাদক পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়াই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

