জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের অর্থনীতি এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষের ওপর ক্রমেই বাড়ছে চাপ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, তীব্র তাপপ্রবাহ ও জলবায়ুজনিত কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। অথচ শ্রমিকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বছরে মাত্র ৮৭৩ কোটি থেকে ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয় হলেই দেশের প্রায় ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তির আয় ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪.৯ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। এই শ্রমিকদের আয় পুরোপুরি নির্ভর করে তাদের দৈনিক কর্মক্ষমতার ওপর। কিন্তু তীব্র দাবদাহে বাইরে কাজ করা শ্রমিকরা বছরে গড়ে ২৩.৭ দিন এবং ঘরের ভেতরে কাজ করা শ্রমিকরা ১৩.৫ দিন কর্মদিবস হারাচ্ছেন। এর ফলে তাদের বার্ষিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।
শুধু কর্মঘণ্টা নয়, তাপপ্রবাহ শ্রমিকদের স্বাস্থ্যেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। জরিপে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের ২৩.১ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের কিডনি সমস্যায় ভুগছেন। গবেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত তাপমাত্রায় কাজ করার ফলে দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের প্রায় ৬ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এছাড়া হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত অধিকাংশ শ্রমিকই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারেন না।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, চরম তাপমাত্রা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ২০২৪ সালে তাপজনিত শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে দেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস হারিয়ে যায়। নতুন গবেষণার প্রাক্কলনে বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহের কারণে অসুস্থতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় বছরে প্রায় ১১৮ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের সরাসরি হারানো মজুরির পরিমাণ প্রায় ৪১০ কোটি ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ০.৯১ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত ক্ষতি যুক্ত করলে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬২২ কোটি ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান শ্রম আইন ও বিধিমালায় কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ তাপমাত্রার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। তীব্র তাপপ্রবাহের সময় বাধ্যতামূলক বিরতি, নমনীয় কর্মঘণ্টা কিংবা তাপজনিত অসুস্থতাকে পেশাগত রোগ হিসেবে স্বীকৃতিরও সুস্পষ্ট বিধান নেই। ফলে চরম তাপমাত্রায় কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হলে শ্রমিকদেরই পুরো ক্ষতির ভার বহন করতে হচ্ছে।
গবেষণায় শ্রমিকদের সুরক্ষায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তাপমাত্রাভিত্তিক নগদ সহায়তা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাদ্য সহায়তা, কর্মস্থলে বিশুদ্ধ পানীয় জল ও ইলেকট্রোলাইট সরবরাহ এবং ছায়াযুক্ত স্থানে বাধ্যতামূলক বিরতির ব্যবস্থা।
গবেষকদের মতে, বছরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয় করে এই সুরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যা জলবায়ুজনিত ৭৭ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক ক্ষতির তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। তাদের মতে, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও আয় সুরক্ষিত করা গেলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিও আরও স্থিতিশীল হবে।

