রবিবার

২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৬ কোটি টাকার খননেও পানিশূন্য গাজীখালী নদী

🕙 প্রকাশিত : ২১ জুন, ২০২৬ । ১২:৫২ অপরাহ্ণ

গাঙ কাটার পর থিকা পানি আহে না। আগে ছোটবেলায় নদীতে ট্রলার চলতে দেখছি, বড় বড় নৌকা চলত। পানিতে গাঙ ভইরা যাইত, অনেক স্রোত ছিল। কত মাছ মারতাম। গাঙ কাটার পর পানি আসা বন্ধ হইয়া গেছে। কয়েক বছর আগে নদী কাটলেও ঠিকমতো কাটা হয় নাই।’— গাজীখালীর বুকে হেঁটে চলতে চলতে এভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন সাটুরিয়ার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ।

বর্ষাকালে নদীটি থাকার কথা ছিল পানিতে থইথই। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বর্ষার শুরুতেই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে সাটুরিয়া উপজেলার গাজীখালী নদী। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি জমে থাকলেও তা ঢেকে গেছে কচুরিপানায়। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গাজীখালী নদীর উৎপত্তি গোপালপুর এলাকায় ধলেশ্বরী নদী থেকে। এরপর এটি ধামরাই হয়ে বংশী নদীতে গিয়ে মিশেছে। একসময় বর্ষা মৌসুমে ধলেশ্বরী নদী থেকে বিপুল পানি গাজীখালীতে প্রবেশ করত। এতে নদীটি পানিতে ভরে উঠত এবং আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত থাকত। নদীর এই পানির ওপর নির্ভর করেই কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা পরিচালিত হতো।

স্থানীয়দের মতে, শত বছরেরও বেশি আগে গাজীখালী নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল সাটুরিয়া বাজার। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় নৌকায় করে ব্যবসায়ীরা এই বাজারে আসতেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে নদীটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এখন।

বর্তমানে গোপালপুর থেকে সাটুরিয়া বাজার পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার নদীপথের অধিকাংশ অংশ শুকিয়ে গেছে। সাটুরিয়া থেকে ধামরাইয়ের বারবারিয়া এলাকা পর্যন্তও একই অবস্থা বিরাজ করছে। পুরো নদীজুড়ে কচুরিপানার জট সৃষ্টি হওয়ায় কোথাও কোথাও পানি থাকলেও তা চোখে পড়ে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া, সদর ও সিঙ্গাইর এবং ঢাকার ধামরাইয়ের সীমান্তবর্তী প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গাজীখালী নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাটুরিয়া, ধামরাই ও সিঙ্গাইর অংশে নদী খননে ব্যয় হয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে সাটুরিয়া অংশে দুই দফায় নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী নদী দুই মিটার গভীর করে খনন এবং তলদেশে ২৬ মিটার ও ওপরের অংশে স্থানভেদে ৫০ থেকে ৬০ মিটার প্রশস্ত করার কথা ছিল। খননকাজে এক্সকাভেটর ব্যবহারেরও নির্দেশনা ছিল।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও নদীর নাব্যতা ফেরেনি। বরং খননের নামে অনিয়ম হয়েছে এবং প্রকল্পের সুফল মেলেনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, একসময় সাটুরিয়া বাজারের খাদ্যগুদাম পর্যন্ত গাজীখালী নদীর বিস্তৃতি ছিল। কিন্তু নদী ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তারা অভিযোগ করেন, নদী খননের নামে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর বিভিন্ন অংশে পানির প্রবাহ নেই বললেই চলে। কোথাও কোথাও সামান্য পানি থাকলেও কচুরিপানার ঘন স্তরে তা আচ্ছাদিত। ফলে নদীনির্ভর জেলে পরিবারগুলো মাছ শিকার করতে না পেরে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে।

উপজেলার দরগ্রাম এলাকার জেলে জ্যোতিন রাজবংশীর সঙ্গে কথা হয়। বললেন, ‘আগে নদীতে যেমন পানি আইত, তেমন মাছও পাইতাম। শত শত জেলে এই নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাইত। এখন নদীতে পানি নাই, মাছ মারুম কেমনে? অনেক জেলে এখন অন্য পেশায় চলে গেছে।’

শেখরীনগর গ্রামের বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেছেন, ‘ছোটবেলায় বর্ষার শুরুতেই গাজীখালীতে নতুন পানি আসত। তখন আমরা সবাই মাছ ধরতাম। নতুন পানিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। নদীতে শুশুকও উঠত। এখন নদীতে পানি আসে না। কয়েক বছর আগে নদী খনন করে শুধু মাটি বিক্রি করে অনেকে লাভবান হয়েছে, কিন্তু নদীর নাব্যতা ফেরেনি।’

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেছেন, ‘আমি যোগদানের আগে গাজীখালী নদীর পুনঃখননের কাজ হয়েছে। তাই সে বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব না। বর্তমানে নদীতে পানি না আসার প্রধান কারণ হলো ধলেশ্বরী নদীর গোপালপুর এলাকার উৎসমুখ যমুনা নদীর পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া। উৎসমুখ পুনঃখনন করা গেলে নদীতে আবারও পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।’

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নদীর উৎসমুখ দ্রুত খনন এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে গাজীখালী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা হবে। অন্যথায় একসময় সাটুরিয়ার প্রাণ হিসেবে পরিচিত নদীটি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ