শুক্রবার

১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানিকগঞ্জের স্বাস্থ্যখাতে চরম নৈরাজ্য, কথিত হাসপাতালের শয্যা জালিয়াতিতে রাজস্ব ফাঁকি

🕙 প্রকাশিত : ১ মে, ২০২৬ । ১২:০২ অপরাহ্ণ

মানিকগঞ্জ জেলা শহরের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের গেট থেকে দালাল দিয়ে রোগী ভাগিয়ে আনা, লাইসেন্সের মেয়াদ ছাড়াই বছরের পর বছর কার্যক্রম চালানো এবং ২০ শয্যার অনুমোদন নিয়ে প্রায় ৮০ শয্যার বাণিজ্য করার মতো ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে মাসব্যাপী এক দীর্ঘ অনুসন্ধানে। আইনের তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের নাকের ডগায়ই চলছে এই ‘চিকিৎসা বাণিজ্য’। সেবার নামে এসব প্রতিষ্ঠানে রোগীদের পকেট কাটাই মূল লক্ষ্য, যেখানে খোদ সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাই পর্দার অন্তরাল থেকে কলকাঠি নাড়ছেন।

জানা গেছে, মানিকগঞ্জের অধিকাংশ হাসপাতালেরই কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল না থাকায় অনেক হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন স্থগিত রাখা হয়েছে। তবুও তারা বহাল তবিয়তে কার্যক্রম চালাচ্ছে এসব কথিত হাসপাতাল।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিজয় মেলা মাঠ সংলগ্ন নগর ভবন সড়কের ‘অ্যাপোলো হাসপাতাল’-এর লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২০ সালের ৩০ জুন। চার বছর ধরে অবৈধভাবে চলা এই প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো দক্ষ জনবল, নেই কোনো স্থায়ী সোনোলজিস্ট বা রেডিওলজিস্ট। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি ছাড়াই অদক্ষ কর্মীদের দিয়ে আল্ট্রাসনোগ্রাম ও এক্স-রের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এছাড়া ১০ শয্যার অনুমোদন থাকলেও সেখানে ১৭ শয্যায় রোগী রেখে রোগীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে প্রতিষ্ঠানটি। সিজারিয়ান প্রসব পদ্ধতি কেন্দ্রীক অর্থ দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে এ হাসপাতালটি।

একই দশা ‘মানিকগঞ্জ অর্থোপেডিক এন্ড জেনারেল হাসপাতাল’-এর। ২০২৩ সালে লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়া এই হাসপাতালে দালালের মাধ্যমে হাড়ভাঙা রোগীদের ফুসলিয়ে এনে জিম্মি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ধরা পড়েছে বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন জয়রা রোডের ‘মানিকগঞ্জ শিশু এন্ড জেনারেল হাসপাতাল’-এ। ২০২৩ সালের জুনে এর লাইসেন্স শেষ হলেও নানা অনিয়মের দায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন করে কোনো অনুমোদন দেয়নি। নানা সময় বিভিন্ন সংবাদপত্রে এই হাসপাতালের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও কোন অদৃশ্য ক্ষমতাবলে হাসপাতালটি পাড় পেয়ে গেছে।

দৈনিক টেলিগ্রাম

সরেজমিনে দেখা গেছে, ২০ শয্যার অনুমোদন থাকলেও সেখানে প্রায় ৮০ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই যে, হাসপাতালের স্টোর রুম এবং নামাজের ঘরেও বেড পেতে রোগী রাখা হয়েছে। আল্ট্রা রুমে বেডের ওপর রক্তমাখা সিরিঞ্জ পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যা থেকে মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিটি কেবিন থেকে প্রতিদিন ১২০০ টাকা ও ওয়ার্ডের বেড থেকে ৭০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে, ৫ তলা ভবনের সব তলায় নার্স স্টেশন নেই; যে তলায় আছে সেখানে নার্সের বদলে কেবিন বানিয়ে রোগী রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তারা নাম পরিবর্তন করে বড় ডিজিটাল বোর্ডে ‘মানিকগঞ্জ শিশু হাসপাতাল’ লিখে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছে সরকারি হাসপাতালের এক প্রভাবশালী চিকিৎসক সিন্ডিকেট। জানা যায়, শিশু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মো. নাছির হোসেন নামের এক চিকিৎসক এই জালিয়াতির মূল হোতা। তিনি প্রতিদিন গড়ে দুই শতাধিক রোগী দেখেন এবং তাঁদের বড় একটা অংশকে কৌশলে নিজের মালিকানাধীন ও পার্টনারশিপে চলা এই অনুমোদনহীন শিশু হাসপাতালে পাঠান। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর অধিকাংশই ডা. নাছিরের পরামর্শে সেখানে এসেছেন। নিজের কর্মস্থলের চেয়ে বেসরকারি এই ‘মরণফাঁদেই’ তাঁর আস্থা বেশি, কারণ সেখানে রয়েছে বিপুল আর্থিক মুনাফা।

এদিকে, ভুক্তভোগীদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পরিবেশ। সিড়ি দিয়ে নামার সময় ক্রন্দনরত এক বৃদ্ধা বলেন, “সকাল থেকে নাতিকে রেখে দুপুরে বলতেছে এখানে চিকিৎসা হবে না। সব টাকা আর ওষুধের বিল না মিটাইলে আমাদের ছাড়ছে না।”

রোগীর সাথে থাকা আরেক অভিভাবক অভিযোগ করেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে চতুর কৌশলে তাঁদের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। নার্স স্টেশন ও পরিচ্ছন্নতার অভাব থাকায় রোগীরা এখানে প্রতিটি মুহূর্তে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকছেন।

এদিকে, অনুসন্ধানকালে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে হাসপাতালের দুই পরিচালক পালিয়ে যান। ম্যানেজার কাইয়ুম আলী ফাহাদ সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেন এবং বসে মীমাংসা করার প্রস্তাব দেন।

প্রশাসনিক পরিচালক পরিচয়দানকারী মো. জিয়াউল হক জুয়েল (যিনি ডিপ্লোমাধারী ডিএমএফ হয়েও নিজেকে বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদ দাবি করেন) সাংবাদিকদের সাথে উদ্ধত আচরণ করেন। তিনি ২০ শয্যার জায়গায় ৮০ শয্যা চালানোকে ‘মানবসেবা’ বলে দাবি করেন, যদিও শয্যা জালিয়াতি ও সরকারের রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

হাসপাতালের আরেক পরিচালক মো. সেলিম মিয়া মুঠোফোনে লাইসেন্স না থাকার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমাদের ২০ শয্যার অনুমোদন রয়েছে। এসময়, প্রায় ৮০ শয্যার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি সামনাসামনি দেখা করে আলাপচারিতার আমন্ত্রন জানান এবং নিউজটি না করার জন্য অনুরোধ করেন।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘The Medical Practice and Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance, 1982’ এর কঠোর লঙ্ঘন হচ্ছে এখানে। আইন অনুযায়ী, অনুমোদিত শয্যা সংখ্যার অতিরিক্ত রোগী রাখা সরাসরি অপরাধ। আইন বলছে, লাইসেন্সবিহীনভাবে ক্লিনিক পরিচালনা করা দণ্ডনীয় অপরাধ, এতে সিলগালাসহ জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। এক নামে অনুমোদন নিয়ে ভিন্ন নাম প্রচারেরও কোনো সুযোগ নেই!

সার্বিক বিষয়ে মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম মুফাখখারুল ইসলাম বলেন, “আমরা এই অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ হাসপাতালগুলোর বিষয়ে জানি। এখানে বেশ কিছু অপরিকল্পিত হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। লাইসেন্স না থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে আমাদের সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট পাওয়ার না থাকায় তাৎক্ষণিক জরিমানা করা সম্ভব হয় না, আমাদের মোবাইল কোর্টের সহায়তা নিতে হয়। “

নির্দিষ্ট পরিমান শয্যার অনুমোদন নিয়ে অতিরিক্ত পরিচালনার ব্যপারে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন সুস্পষ্টভাবে বলেন, অতিরিক্ত শয্যা পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

স্বাস্থ্য খাতের এই ভয়াবহ নৈরাজ্য বন্ধে এবং সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে অবিলম্বে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি বিশেষ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। অবিলম্বে লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিকগুলো সিলগালা করা এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া ও মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা মালিকদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবী জানিয়েছে মানিকগঞ্জের সচেতন মহল।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ