আধুনিক জীবনে সুস্থ থাকার অন্যতম শর্ত হিসেবে টানা আট ঘণ্টা ঘুমানোর ধারণা বেশ প্রচলিত। তবে ইতিহাস ও বিজ্ঞান বলছে, মানুষের ঘুমের প্রাকৃতিক ধরন সবসময় এমন ছিল না। বরং একটানা নয়, দুই দফায় ঘুমানো—যাকে বলা হয় বাইফ্যাসিক স্লিপ—হতে পারে আরও স্বাভাবিক ও কার্যকর একটি পদ্ধতি।
ইতিহাসবিদ রজার একির্চ-এর গবেষণায় দেখা যায়, শিল্প বিপ্লবের আগে মানুষ সাধারণত দুই ধাপে ঘুমাত। সূর্যাস্তের পর ঘুমিয়ে রাত ১০টা বা ১১টার দিকে প্রথম দফা ঘুম ভাঙত। এরপর প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা জেগে থেকে তারা বিভিন্ন কাজ—যেমন পড়াশোনা, প্রার্থনা বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—করতেন। এরপর আবার দ্বিতীয় দফায় ঘুমিয়ে ভোর পর্যন্ত বিশ্রাম নিতেন।
বিজ্ঞানও এই ধারণাকে সমর্থন করে। মনোবিজ্ঞানী টমাস ওয়্যার-এর গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলো থেকে দূরে রেখে দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকলে মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবেই এই দ্বিখণ্ডিত ঘুমের ছন্দে ফিরে যায়। এ সময় শরীরে প্রোল্যাকটিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা মানসিক প্রশান্তি ও সৃজনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া-এর পেছনে এই প্রাচীন ঘুমের ছন্দের প্রভাব থাকতে পারে। অর্থাৎ, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া সবসময় সমস্যা নয়—এটি শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক আচরণও হতে পারে।
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপে কৃত্রিম আলোর বিস্তার এবং শিল্প বিপ্লবের পর মানুষের জীবনযাত্রা বদলে যায়। রাত জাগা, কাজের চাপ এবং কফি সংস্কৃতি ধীরে ধীরে এই দ্বিখণ্ডিত ঘুমের অভ্যাসকে হারিয়ে দেয়।
আধুনিক গবেষণা বলছে, বিশেষ করে যারা সৃজনশীল বা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে যুক্ত—যেমন ছাত্র, গবেষক বা লেখক—তাদের জন্য মাঝরাতের এই জেগে থাকার সময়টি হতে পারে অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এটি চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ঘুমের ক্ষেত্রে একক কোনো নিয়ম সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। বরং নিজের শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বুঝে ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে সুস্থ ও কার্যকর জীবনের চাবিকাঠি।
টানা ৮ ঘণ্টা নয়, দুই দফায় ঘুম—সুস্থতা ও সৃজনশীলতায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
🕙 প্রকাশিত : ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ । ৭:১০ পূর্বাহ্ণ

