বর্তমান নগরজীবনে “খামার থেকে সরাসরি দুধ” ধারণাটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। অনেক ভোক্তার বিশ্বাস, খামার থেকে সংগৃহীত কাঁচা দুধ বাজারজাত প্রক্রিয়াজাত দুধের তুলনায় বেশি বিশুদ্ধ, পুষ্টিকর ও ভেজালমুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক বিপণনের প্রসারের ফলে এই বাজার সম্প্রসারণও ঘটছে দ্রুতগতিতে। তরুণ উদ্যোক্তারা আধুনিক খামার গড়ে সরাসরি ভোক্তার কাছে দুধ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন, যা দেশের দুগ্ধশিল্পের জন্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এই আস্থার মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে—বিশুদ্ধতার দাবির সঙ্গে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কতটা রয়েছে?
দুধ অত্যন্ত সংবেদনশীল খাদ্যপণ্য। উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ না করলে এটি সহজেই রোগজীবাণুর বাহকে পরিণত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিশোধিত বা কাঁচা দুধে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু থাকার আশঙ্কা থাকে, যা শিশু, বয়স্ক ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই ঝুঁকি আরও প্রকট। কারণ, কাঁচা দুধের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় এখনও কার্যকর তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, দুধ সংগ্রহের দুই ঘণ্টার মধ্যে শীতলীকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে বহু ক্ষেত্রেই তা মানা হয় না। গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে পরিবহনের সময় প্রয়োজনীয় কোল্ড চেইন ব্যবস্থার অভাবও বড় সমস্যা। ফলে দুধে জীবাণু বৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়ে যায়। উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও এ খাতের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা, মান নিরীক্ষা ও তদারকি ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়।
বিশ্বের অনেক দেশ এ বিষয়ে কঠোর নীতি অনুসরণ করে। কোথাও কাঁচা দুধ বিক্রির জন্য বিশেষ লাইসেন্স বাধ্যতামূলক, কোথাও নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক মান যাচাই ও পশুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা নিশ্চিত করা হয়। আবার কিছু দেশ জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় কাঁচা দুধের খুচরা বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রেখেছে। অর্থাৎ, ভোক্তার পছন্দের স্বাধীনতা থাকলেও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা হয় না।
বাংলাদেশেও একই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। খামার থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন শীতলীকরণ, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত তদারকির ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে পারে আধুনিক ও নিরাপদ দুগ্ধব্যবস্থা। পাশাপাশি জনগণকে নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দেশে দুধ উৎপাদন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও চাহিদা ও যোগানের ব্যবধান এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। সরকারি ও খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় দেড় কোটি মেট্রিক টনের কাছাকাছি দুধ উৎপাদিত হলেও পুষ্টিচাহিদার তুলনায় তা এখনও কম। ফলে গুঁড়া দুধসহ কিছু দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা রয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপদ বিপণন গড়ে তুলতে পারলে দুগ্ধশিল্প দেশের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী খাতে পরিণত হতে পারে।
তবে সম্ভাবনার এই যাত্রা টেকসই হবে কেবল তখনই, যখন বিশুদ্ধতার দাবির পাশাপাশি নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও নিশ্চিত করা যাবে। খাদ্যের ক্ষেত্রে কেবল আস্থাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক মান নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

