শনিবার

১৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পোশাকশিল্পের সংকট ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ

🕙 প্রকাশিত : ১৬ মে, ২০২৬ । ১:১১ অপরাহ্ণ

একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক শক্তি এবং সামাজিক ভারসাম্য অনেকাংশেই নির্ভর করে তার কর্মসংস্থানের ওপর। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, সেই রাষ্ট্রের ভিত হয় মজবুত। বিপরীতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হলে ধীরে ধীরে সমাজে হতাশা, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে। কারণ বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতারও অন্যতম কারণ।

সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের রপ্তানি আয়ের মূল উৎস হিসেবে কাজ করে আসছে। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। ফলে এই শিল্পে সংকট মানে শুধু কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নয়, বরং তার প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং লাখো পরিবারের জীবনে।

একটি পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়া মানে বহু শ্রমিকের কর্মহীন হয়ে পড়া, অসংখ্য পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং স্থানীয় অর্থনীতির গতি কমে যাওয়া। ব্যাংক, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে না। অর্থাৎ পোশাকশিল্পের সংকট একটি বহুমাত্রিক জাতীয় সংকটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে নানা কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ক্রেতাদের কম দামে পণ্য কেনার চাপ, দেশে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তুলেছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি মানবিক ও ন্যায্য হলেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। ফলে উদ্যোক্তা ও শ্রমিক—উভয় পক্ষই এক ধরনের অনিশ্চয়তার বৃত্তে আটকে পড়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা। কাস্টমস প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, বন্ড সুবিধা পেতে বিলম্ব, কাঁচামাল খালাসে বাধা এবং এইচএস কোড সংক্রান্ত জটিলতায় আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে।

বিশ্ববাজারেও বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠছে। ভিয়েতনাম, ভারত ও চীন নিজেদের রপ্তানিকারকদের নানা ধরনের প্রণোদনা ও করসুবিধা দিচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশে যদি করের চাপ, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতা বাড়তে থাকে, তবে এই খাতের ভবিষ্যৎ আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

শিল্পনীতি কখনো শুধু রাজস্ব আদায়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত হতে পারে না। এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শিল্প টিকে থাকলে শ্রমিকের কর্মসংস্থান টিকে থাকবে, আর শ্রমিকের জীবনমান নিশ্চিত না হলে শিল্পের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই এমন নীতি প্রয়োজন, যা একইসঙ্গে শিল্পকে টিকিয়ে রাখবে এবং শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা করবে।

ইতিহাস বলে, দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব সমাজে অপরাধ, উগ্রতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই পোশাকশিল্প রক্ষা মানে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

এই মুহূর্তে সরকারের উচিত দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রদান করা। কর ও ভ্যাট কাঠামো সহজ করা, কাস্টমস ও বন্ড প্রক্রিয়া দ্রুততর করা, রপ্তানিকারকদের জন্য সহজ ব্যাংক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে বাস্তবসম্মত জ্বালানি নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। কারণ কর্মসংস্থান রক্ষা মানেই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষা।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ