রবিবার

১৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কারাগারের স্বাস্থ্যসংকট: মানবিক রাষ্ট্রের জন্য এক কঠিন প্রশ্ন

🕙 প্রকাশিত : ১০ মে, ২০২৬ । ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ

একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য ও মানবিক—তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো সেই রাষ্ট্র তার হেফাজতে থাকা মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। কারাগারে থাকা ব্যক্তি অপরাধী, অভিযুক্ত কিংবা বিচারাধীন যাই হোন না কেন, তারা রাষ্ট্রের নাগরিক। তাদের জীবন, চিকিৎসা ও ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু দেশের কারাগারগুলোর বর্তমান বাস্তবতা সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ভয়াবহ দুর্বলতার চিত্রই সামনে আনছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের ৭৪টি কারাগারের মধ্যে ৫৪টিতেই কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। ফলে কোনো বন্দি হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো ন্যূনতম ব্যবস্থাও অনেক কারাগারে অনুপস্থিত। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে লেগুনা বা ভাড়ার সাধারণ যানবাহনে করে অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। এটি শুধু অব্যবস্থাপনার উদাহরণ নয়, বরং মানবাধিকারের মৌলিক প্রশ্নও বটে।
বাংলাদেশের কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা যেখানে প্রায় ৪২ হাজার, সেখানে বাস্তবে বন্দির সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি। অথচ চিকিৎসাসেবার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অনুমোদিত ১৪৬টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে স্থায়ীভাবে কর্মরত আছেন মাত্র দুইজন চিকিৎসক। এমন পরিস্থিতি শুধু উদ্বেগজনক নয়, রাষ্ট্রীয় অবহেলারও স্পষ্ট প্রতিফলন।
প্রশ্ন উঠতেই পারে—যে দেশে উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়, সেখানে কারাগারের জন্য কয়েক ডজন চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় অ্যাম্বুলেন্স নিশ্চিত করতে বছরের পর বছর কেন অপেক্ষা করতে হয়? সমস্যাগুলো নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে বৈঠক, প্রস্তাব ও পরিকল্পনার কথা শোনা গেছে। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। এই দীর্ঘসূত্রতা শেষ পর্যন্ত বন্দিদের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি পরিবার, থাকে স্বজনদের দীর্ঘ বেদনা। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে যদি কোনো বন্দির মৃত্যু হয়, তবে তার দায় কেবল ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত উদাসীনতা এবং মানবিক দায়বদ্ধতার সংকট।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের কারাগারে থাকা বিপুলসংখ্যক বন্দি এখনো আদালতে দোষী সাব্যস্ত হননি। বিচারাধীন এসব মানুষ আইনের চোখে এখনো নির্দোষ। অথচ তারাও একই অব্যবস্থা ও অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন বাস্তবতা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
সম্প্রতি ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের অনুমোদন ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এটুকু দিয়ে সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন প্রতিটি কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থাপনা। কারাগার কেবল শাস্তির স্থান নয়; এটি সংশোধন ও পুনর্বাসনেরও জায়গা। অবহেলায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে কোনো সমাজ নিজেকে সভ্য দাবি করতে পারে না।
বাংলাদেশে মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা হলেও কারাগারের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। অথচ রাষ্ট্রের মানবিক চেহারা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় এই দেওয়ালের আড়ালেই। মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়তে চাইলে কারাগারের স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার সংকটের স্থায়ী সমাধানে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় কারাগারের অন্ধকারে নীরবে বাড়তেই থাকবে মৃত্যু, আর মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন সীমাবদ্ধ থাকবে কেবল কথার মধ্যেই।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ