দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ ঘাটতি ও জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাত গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ক্রমেই জেনারেটরনির্ভর হয়ে উঠছে, যা বড় ধরনের যোগাযোগ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সংকট কেবল পরিচালনাগত সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল সংযোগ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব) এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-কে চিঠি দিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল অপারেটরদের বেস স্টেশন, ডাটা সেন্টার ও সুইচিং সেন্টার সচল রাখতে প্রায় সম্পূর্ণভাবে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
অপারেটরদের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখতে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ লিটার জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে। এর মধ্যে বিটিএস সাইট পরিচালনায় প্রতিদিন ৫২ হাজার ৪২৫ লিটার ডিজেল ও ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন ব্যবহৃত হচ্ছে। ডাটা সেন্টার ও সুইচিং স্থাপনাগুলোর জন্য প্রতিদিন প্রয়োজন হচ্ছে আরও ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার ডিজেল খরচ হচ্ছে।
গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা ও বাংলালিংক—এই তিন অপারেটরের জ্বালানি ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। কেবল ডাটা সেন্টার পরিচালনাতেই প্রতিদিন ২৭ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল ব্যয় হচ্ছে তাদের।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর একটি কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ করছে, যেখানে পুরো ব্যবস্থাই জেনারেটরনির্ভর হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ডাটা সেন্টারগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা পুরো নেটওয়ার্কের ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে কাজ করে।
অ্যামটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, “ডাটা সেন্টারে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।”
বর্তমানে দেশে ১৮ কোটি ৫০ লাখের বেশি মোবাইল গ্রাহক রয়েছে। ফলে এই খাতকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
খাত সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। ইতোমধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ব্যবহারকারী সেবার মানে অবনতি অনুভব করছেন, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহারকারী, অর্থাৎ ১১ কোটির বেশি মানুষ আংশিক বা সম্পূর্ণ সেবা বিঘ্নের মুখে পড়তে পারেন।
সেবার মান অবনতির লক্ষণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে কল ড্রপ, ধীরগতির ইন্টারনেট এবং বিদ্যুৎহীন এলাকায় ‘ব্ল্যাক জোন’ তৈরি হওয়া।
অ্যামটব জানায়, জ্বালানি ঘাটতির পাশাপাশি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। জেলা পর্যায়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন, ডিপো থেকে সরাসরি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং জরুরি পরিবহনে বিধিনিষেধ—এসব কারণে নেটওয়ার্ক সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
টেলিযোগাযোগ খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, এই সংকট দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ডিজিটাল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, রফতানিমুখী শিল্প এবং সরকারি সেবাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম বলেন, “স্থিতিশীল বিদ্যুৎ ও সমন্বিত জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে সাময়িক বিঘ্ন স্থায়ী ‘ব্ল্যাক জোনে’ পরিণত হতে পারে।”
গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “ডাটা সেন্টারের জন্য বিদ্যুতে অগ্রাধিকার এবং জ্বালানি সরবরাহ সহজ করা জরুরি।”
বাংলালিংকের কর্মকর্তা তাইমুর রহমানও বলেন, “টেলিযোগাযোগ খাতকে জরুরি সেবা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাস্তবে সেই গুরুত্ব প্রতিফলিত হচ্ছে না।”
সংকটের কথা স্বীকার করে বিটিআরসির চেয়ারম্যান জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের নেটওয়ার্ক বিপর্যয় ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য ক্রমেই বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।
সূত্র: ইত্তেফাক

