গতকাল পালিত হলো বিশ্ব কিডনি দিবস। কিডনির গুরুত্ব বোঝাতে একটি পুরোনো বিদেশি গল্পের কথা মনে করা যেতে পারে। বহু সহস্র বছর আগে এক ব্যক্তি নাকি দেবদূতের কাছ থেকে এক আশ্চর্য বর পেয়েছিলেন—দুটি অমর কিডনি। দেবদূত তাকে বলেছিলেন, এই কিডনি কখনো বিকল হবে না, কখনো অসুস্থ হবে না। যতদিন পৃথিবী থাকবে, ততদিন এই কিডনি তাকে জীবিত রাখবে। ফলে সেই মানুষটি হাজার বছর পেরিয়েও সুস্থভাবে বেঁচে ছিলেন।
গল্পটি নিঃসন্দেহে রূপক। বাস্তব জীবনে মানুষের ভাগ্যে এমন অলৌকিক বর জোটে না। কিন্তু গল্পটির অন্তর্নিহিত সত্যটি গভীর—মানুষের সুস্থ জীবন অনেকাংশেই নির্ভর করে কিডনির সুস্থতার ওপর। মানবদেহের এই ছোট অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি প্রতিদিন নীরবে অসংখ্য কাজ করে চলে। কিডনি রক্ত পরিশোধন করে, শরীরের অতিরিক্ত বর্জ্য অপসারণ করে, পানি ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ হরমোন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে।
কিন্তু সমস্যাটি হলো, কিডনি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলেও অনেক সময় মানুষ তা বুঝতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ কার্যক্ষমতা নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কিডনি রোগের লক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয় না। ফলে রোগ ধরা পড়ার সময় পরিস্থিতি অনেকটাই জটিল হয়ে ওঠে।
বর্তমানে কিডনি রোগ বিশ্বজুড়ে একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও কয়েক কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক রোগী ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনীয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। এরই মধ্যে এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন বাস্তবতা—জলবায়ু পরিবর্তন।
দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনকে মূলত পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, এর প্রভাব মানবস্বাস্থ্যের ওপরও গভীর। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়ছে। অতিরিক্ত গরমে মানুষের শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়, যা কিডনির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক কিংবা খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘ সময় কাজ করা মানুষ এই ঝুঁকির মুখে বেশি পড়েন। দীর্ঘমেয়াদি পানিশূন্যতা অনেক সময় আকস্মিক কিডনি বিকলের কারণও হতে পারে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তারও কিডনি স্বাস্থ্যের জন্য নতুন বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পানিতে অতিরিক্ত লবণ ও বিভিন্ন দূষিত উপাদান দীর্ঘমেয়াদে কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া বন্যা, পরিবেশ দূষণ এবং কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণেও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে কিডনি রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। পর্যাপ্ত পানি পান করা, অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা—এসব অভ্যাস কিডনি সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও জরুরি। বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং প্রস্রাব পরীক্ষা করা হলে প্রাথমিক পর্যায়েই অনেক সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব।
বিশ্ব কিডনি দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়—মানুষ যত আধুনিকই হোক, সুস্থ জীবন শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে দেহের এই নীরব অঙ্গটির ওপর। সেই বিদেশি গল্পের মানুষের মতো অমর কিডনি আমাদের নেই। তাই আমাদের দায়িত্ব একটাই—আমাদের এই অমূল্য কিডনিকে যত্নে রক্ষা করা। কারণ সুস্থ কিডনি ছাড়া সুস্থ জীবন শেষ পর্যন্ত কেবলই এক কল্পকথা।

