বুধবার

২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বজ্রপাত: দুর্যোগের বিরুদ্ধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

🕙 প্রকাশিত : ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ । ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ

ভুটান-কে বজ্রপাতের দেশ বা ‘Land of the Thunder Dragon’ বলা হয় । হিমালয় পর্বতমালা থেকে নেমে আসা প্রচণ্ড ও ভয়ানক বজ্রঝড়ের কারণে দেশটিকে এই নামে ডাকা হয়। ভুটানের নিজস্ব ভাষায় একে ‘দ্রুক ইয়ুল (Druk Yul) বলা হয়, যা বজ্র ড্রাগনের দেশ অর্থ বহন করে। ভুটানের উপত্যকায় প্রায়শই তীব্র বজ্রপাত হয়, যা হিমালয়ের চূড়া থেকে আসা ড্রাগনের গর্জন বা আগুনের শিখা বলে স্থানীয়রা বিশ্বাস করতেন। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থানের কারণে এবং পাহাড়ি উপত্যকার মধ্য দিয়ে শক্তিশালী বজ্রঝড় প্রবাহিত হওয়ায় এটি পরিচিত। ভুটানে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ দিন বজ্রপাত হয়। এই বজ্রপাতের কারণে ভুটানে প্রতিবছর কমবেশি ১০০ জন মানুষ মারা যায়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হওয়া স্থান হিসেবে ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো হ্রদকে চিহ্নিত করা হয়, কিন্তু ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ‘বজ্রপাতের দেশ হিসেবে ভুটানই সুপরিচিত ।

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙনের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত একটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা ও প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, যা দেশের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বজ্রপাতের বড়ো কারণগুলোর একটি হলো খোলা মাঠে উঁচু গাছ ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব। অনেক এলাকায় তালগাছ বা উঁচু বৃক্ষ কমে যাওয়ায় বজ্র নিরোধক প্রাকৃতিক ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে উষ্ণতা, আর্দ্রতা ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বজ্রঝড়ের প্রবণতা বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতা এবং অনিয়মিত আবহাওয়ার ফলে বজ্রপাতের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বিশেষ করে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

বিশ্লেষকদের মতে, শহরে বেশির ভাগ ভবনে বজ্র নিরোধক দণ্ড থাকায় বজ্রপাতে মৃত্যু তেমন হয় না। কিন্তু গ্রামে তা না থাকা এবং বড়ো গাছপালা কমে গিয়ে খোলা মাঠের কারণে সেখানে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। তাদের মতে, দেশের হাওড় এলাকায় বজ্রপাতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। কারণ, সেখানকার বেশির ভাগ ফসলি জমিতে বড়ো কোনো গাছ নেই।

বাংলাদেশে বজ্রপাতে বছরে গড়ে প্রাণ হারান ৩০০ জন এবং সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ জেলা সুনামগঞ্জসহ সিলেটের চার জেলা ও নেত্রকোণা। বৃষ্টি আর ঝড় হলেই বজ্রপাতে একাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফিনল্যান্ডভিত্তিক বজ্রপাতবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ভাইসালার তথ্য মতে বাংলাদেশে বজ্রপাতে যারা মারা যান, তাদের ৭০শতাংশ কৃষক বা যারা খোলা মাঠে কাজ করেন। এ ছাড়া বাড়ি ফেরার পথে ১৪শতাংশ এবং গোসল ও মাছ ধরার সময় ১৩শতাংশ বজ্রপাতের ফলে মৃত্যু হয়েছে।

বজ্রপাতকে সরকার ২০১৬ সালে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা সমস্যাটির গুরুত্বকে তুলে ধরে। তবে শুধু ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন, তাল জাতীয় বৃক্ষ রোপণ, আবহাওয়া সতর্কবার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং স্কুল-কলেজসহ স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বজ্রপাতের সময় মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে না গিয়ে গাছের নিচে বা খোলা জায়গায় অবস্থান করেন, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই গণমাধ্যম, মাইকিং, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মোবাইল বার্তা বা অ্যাপভিত্তিক সতর্কতা ব্যবস্থাও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বজ্রপাত মোকাবিলা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি সামাজিক দায়িত্বও বটে। কৃষি কাজের সময়সূচি পরিবর্তন, নিরাপদ আশ্রয় নির্মাণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্যোগ শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব।

পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪০-৫০টি বজ্রপাত ঘটে। বছরে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন বজ্রপাত হয়। সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলে, বিশেষ করে নিরক্ষীয় এলাকায়। বিশ্বের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল হলো Lake Maracaibo, যেখানে বছরে প্রায় ২৫০ দিনের বেশি বজ্রঝড় দেখা যায়।

বজ্রপাতকে সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জননিরাপত্তার বড়ো চ্যালেঞ্জ। সমন্বিত পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কতা ও সর্বস্তরের জনসচেতনতা এই চারটি পদক্ষেপই পারে বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে।

বজ্রপাত শুধু ক্ষতি করে না এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতাও আছে। বজ্রপাতের সময় আকাশে থাকা নাইট্রোজেন গ্যাস ভেঙে নাইট্রেট যৌগে পরিণত হয়। পরে বৃষ্টির সাথে তা মাটিতে মিশে যায়। এতে মাটি প্রাকৃতিকভাবে সার পায় এবং ফসলের উৎপাদন বাড়ে। বজ্রপাত বায়ুর রাসায়নিক গঠন ঠিক রাখতে সাহায্য করে। এটি বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের ভারসাম্য বজায় রাখে।

বজ্রপাতের শক্তিশালী বিদ্যুৎ চমকের কারণে কিছু ওজোন (O₃) তৈরি হয়, যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীকে আংশিক সুরক্ষা দেয়। প্রকৃতির নাইট্রোজেন চক্রে বজ্রপাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষের তৈরি রাসায়নিক সারের আগেও বজ্রপাত ছিল প্রকৃতির প্রধান নাইট্রোজেন সরবরাহকারী।

বজ্রপাতের পরে বাতাস অনেক সময় সতেজ লাগে। কারণ বজ্রপাত বাতাসের কিছু দূষিত কণা ভেঙে দিতে সাহায্য করে। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই টেকসই নিরাপত্তার একমাত্র পথ। এখনই সচেতন না হলে বজ্রপাতের এই নীরব ঘাতক আমাদের জন্য আরও বড়ো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ (রাইমস)-এর সহায়তায় বজ্রপাতবিষয়ক অগ্রিম সতর্কতা জানাচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও সচেতনতা, পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বজ্রপাত যেন আর নীরব ঘাতক হয়ে না ওঠে এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত অঙ্গীকার। বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় সরকার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। পদক্ষেপগুলো হলো বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেয়।বজ্রপাত থেকে সুরক্ষার জন্য তালগাছ লম্বা হওয়ায় গ্রামাঞ্চলে ব্যাপকভাবে তালগাছ লাগানো হয়েছে। তালগাছ এটি প্রাকৃতিক লাইটনিং অ্যারেস্টর হিসেবে কাজ করে। স্কুল, মাঠ ও খোলা জায়গায় লাইটনিং অ্যারেস্টর বসানো হচ্ছে। বিশেষ করে হাওর ও উন্মুক্ত এলাকায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রচারণা চালাচ্ছে কীভাবে বজ্রপাতের সময় নিরাপদ থাকতে হবে।স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। খোলা মাঠ বা হাওর অঞ্চলে কাজ করা কৃষকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বজ্রপাতের প্রকৃতি বোঝার জন্য গবেষণা বাড়ানো হয়েছে এবং তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথেও সহযোগিতা করা হচ্ছে।বজ্রপাতে নিহত বা আহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু সরকারি প্রস্তুতি নয়, জনগণের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সচেতনতা তৈরিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনে তথ্য অধিদফতর ও জেলা তথ্য অফিস এর প্রচারণা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বিভিন্ন মাধ্যমে দুর্যোগকালীন সচেতনতা বৃদ্ধি করে থাকে। তারমধ্যে তথ্য অধিফতর জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ বিষয়ে নিয়মিত ফিচার প্রচার করে থাকে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া এবং বর্তমানে জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি সোস্যালমিডিয়ার মাধ্যম সতর্কবার্তা, নিরাপত্তা নির্দেশনা ও জরুরি ঘোষণা প্রচার করা হয়। জেলা তথ্য অফিসের মাধ্যমে বজ্রপাতের সময় করণীয় বিষয়ে ভিডিও, পোস্টার ও অডিও বার্তা প্রচার করা হয়।

দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে স্থানীয় ভাষায় দ্রুত তথ্য পৌঁছাতে কমিউনিটি রেডিও বড়ো ভূমিকা রাখে। জেলা তথ্য অফিস প্রতিটি জেলার স্কুল, কলেজ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ক প্রচারণা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কার্যকর প্রচারণা মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে দুর্যোগ মোকাবিলা আরও সফল হবে।

লেখক: সিনিয়র তথ্য অফিসার তথ্য অধিদফতর।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ