জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ঘিরে সরকার-বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি চাপ

🕙 প্রকাশিত : ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৫:১৬ এএম

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার ইস্যুকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বণ্টনকে কেন্দ্র করেও দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

সরকারি দলের অবস্থান, সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল প্রতিনিধি না দিলে তাদের মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহী নয় তারা। অন্যদিকে বিরোধী দলের দাবি, জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদে তাদের আসনের অনুপাতে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির প্রায় ২৬ শতাংশ সভাপতির পদ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

এদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি সামনে রাখার পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলো সংসদে জোরালোভাবে তুলে ধরার কৌশল নিয়েছে বিরোধী দল। একই সঙ্গে রাজপথে কর্মসূচির মাধ্যমেও সরকারকে চাপে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে রাজধানীতে পদযাত্রা করে সংসদের স্পিকারকে স্মারকলিপি দিয়েছে বিরোধী দল। আগামী শনিবার চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের মধ্য দিয়ে নতুন কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বিভাগে লংমার্চ শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

সংসদে কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে বিতর্ক

জুলাই সনদ অনুযায়ী সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বণ্টন নিয়ে গত রবিবার জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়। দীর্ঘ আলোচনা হলেও বিরোধী দলকে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল দেশের স্বার্থে সরকারি ও বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। প্রয়োজনে উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ‘ক্লোজড ডোর’ বা রুদ্ধদ্বার বৈঠকেরও পরামর্শ দেন তিনি।

সংসদে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী তাদের সংসদীয় কমিটির আরও সভাপতির পদ দিতে আপত্তি নেই। তবে এর জন্য সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি দিতে হবে।

সরকারি দলের দাবি, জুলাই সনদের ভিত্তিতে বিভিন্ন দাবি জানালেও সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করা বিরোধী দলের বিপরীতমুখী অবস্থান।

অন্যদিকে বিরোধী দল স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে তারা প্রতিনিধি দেবে না। তাদের অবস্থান হলো, সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করতে হবে।

জুলাই সনদে সভাপতির পদ নিয়ে প্রস্তাব

বিদ্যমান সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে বিভিন্ন সময়ে সংসদীয় রেওয়াজ হিসেবে বিরোধী দলকে এক বা একাধিক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার নজির রয়েছে।

জুলাই সনদের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার কথা। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে।

বর্তমানে সংসদে বিরোধী দলের আসনের অনুপাত প্রায় ২৬ শতাংশ। সেই হিসাবে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে প্রায় ১০টির সভাপতির পদ বিরোধী দলের পাওয়ার কথা। এর সঙ্গে সরাসরি উল্লেখ করা চারটি কমিটি যুক্ত করলে মোট ১৪টি কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার কথা তাদের।

তবে জুলাই সনদের এসব প্রস্তাব এখনো সংবিধানে যুক্ত হয়নি। ফলে সনদ অনুযায়ী এসব পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বর্তমানে তৈরি হয়নি।

সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে বিরোধ

সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। ওই কমিটির জন্য বিরোধী দলকে পাঁচজনের নাম দিতে বলা হলেও তারা তা দেয়নি।

বিরোধী দল শুরু থেকেই ওই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাদের বক্তব্য, সংবিধান সংশোধন নয়, জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার করতে হবে।

রবিবার সংসদে বিতর্কে অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, সংসদে সদস্যসংখ্যার অনুপাতে সংসদীয় কমিটির সদস্য ও অন্যান্য পদ বণ্টনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নেওয়া তাদের নীতিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

জবাবে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, অতীতেও সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছিল। এবারও ওই কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদের জন্য একজনের নাম দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা ওই পদও নেয়নি। এরপর সরকারি দল সিদ্ধান্ত নেয়, জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধন হলে সে অনুযায়ী পদ বণ্টন করা হবে।

তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলোতে সংসদের আসনের অনুপাতে বিরোধী দল সভাপতির পদ পাবে। তবে এজন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।

সংসদ ও রাজপথে সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা

বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্য জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো সামনে আনতে তারা সংসদে আরও সক্রিয় থাকবেন।

চলতি অধিবেশনের প্রথম দিন গত বৃহস্পতিবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন করেন তারা। এসব প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে হইচই ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এতে প্রায় ১৪ মিনিট সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

সরকারি দল বিরোধী দলের এই ভূমিকা পরিকল্পিত বলে মনে করছে।

অন্যদিকে সরকারকে চাপের মধ্যে রাখতে রাজপথেও ধারাবাহিক কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।

বিভাগীয় পর্যায়ে লংমার্চের কর্মসূচি

আগামী শনিবার চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের মধ্য দিয়ে ১১ দলের ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রাথমিকভাবে চার বিভাগে লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও ভবিষ্যতে এর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। এসব কর্মসূচি শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে ১১ দলীয় ঐক্যের।

ফলে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বণ্টনকে কেন্দ্র করে সংসদের ভেতরে যেমন দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে, তেমনি রাজপথেও রাজনৈতিক চাপ তৈরির প্রস্তুতি জোরদার হচ্ছে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ