আস্থাভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

🕙 প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট, ২০২৬ । ১২:৪৯ পিএম

ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত বাংলাদেশে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) জনবান্ধব, দক্ষ ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত রাজস্ব সম্মেলন ২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সাফল্য অনেকাংশেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। তাই রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, দেশের মানুষ এনবিআরকে একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। বিশেষ করে করদাতারা চান, রাজস্ব প্রশাসনের সঙ্গে তাদের আস্থার সম্পর্ক তৈরি হোক। দক্ষ ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেই আস্থা অর্জন করতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের প্রভাব থেকে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো এনবিআরও মুক্ত থাকতে পারেনি। নীতি ও নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে কাউকে সুবিধা দেওয়া, কারও প্রতি বিরূপ মনোভাব এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এর ফলে মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময়।

বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির বিকাশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন এবং নতুন ব্যবসায়িক মডেলের কারণে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এসব মোকাবিলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

ডিজিটাল ইকোনমি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা, বাণিজ্যিক অপরাধ, মানি লন্ডারিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজস্ব কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত এখনো সক্ষমতার তুলনায় কম। অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। তাই শুধু নিয়মিত করদাতাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে।

তিনি বলেন, আধুনিক কর প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু বেশি কর আদায় করা নয়; বরং বেশি সংখ্যক মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা। কর ব্যবস্থাপনা ও কর পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ, হয়রানিমুক্ত এবং দুর্নীতিমুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

একই করদাতার ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিদের শনাক্ত করে যথাযথভাবে করের আওতায় আনতে হবে। এজন্য আধুনিক, ডিজিটাল ও ডাটাভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

ভ্যাটকে আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভ্যাট ব্যবস্থাপনা এমন হতে হবে যাতে এর জটিলতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয়।

কাস্টমস, ভ্যাট কিংবা আয়কর আদায় শুধু কঠোরতার বিষয় নয় মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার প্রতি করদাতাদের আস্থা তৈরি হলে রাজস্ব আহরণ অনেক সহজ হয়। তাই এনবিআরকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে, যাকে মানুষ ভয় না করে বরং বিশ্বাস করবে।

রাজস্ব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে প্রতিষ্ঠান ও দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়। সমস্যা থাকলেও আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেগুলোর সমাধান করা হবে।

সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা যেন নিরাপদ ও স্বস্তির সঙ্গে দেশ গঠনে কাজ করেন। দেশের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করবে।

তিনি আরও বলেন, গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের পরিমাণ ইতিবাচক ছিল। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, রাজস্ব কর্মকর্তারা চাইলে আরও ভালো করতে পারবেন। দেশের স্বার্থে দেশপ্রেম ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে একটি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

সম্মেলনের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে রাজস্ব আদায় ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠান শেষে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। পরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের স্টলে ডিজিটাল স্ক্রিনে বিভিন্ন উপস্থাপনা ঘুরে দেখেন তিনি।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ