প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন, হাওর কিংবা দ্বীপ—প্রকৃতির প্রায় সব রূপই রয়েছে দেশে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সেই প্রকৃতিই এখন পর্যটন খাতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
কখনো ভয়াবহ বন্যা, কখনো পাহাড়ধস, আবার কখনো ঘূর্ণিঝড় কিংবা অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে জলবায়ু সংকটের অন্যতম বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প।
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে কক্সবাজারের পর্যটন এলাকা। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে যায়। কোথাও পাহাড়ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, আবার কোথাও হোটেল-রিসোর্ট খালি হয়ে যায় এবং পর্যটকেরা আটকা পড়েন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এমন পরিস্থিতি তারা দেখেননি। টানা ৮ থেকে ১০ দিনের বৃষ্টিতে ব্যবসায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের বৃষ্টির ধরনও ছিল অনেকটাই ভিন্ন।
পাহাড়, সমুদ্র, বন কিংবা হাওর—দেশের প্রায় সব পর্যটন কেন্দ্রই প্রকৃতিনির্ভর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় এসব গন্তব্য আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। প্রকৃতির পরিবর্তিত আচরণ সরাসরি প্রভাব ফেলছে পর্যটন খাতে।
এর ফলে পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটনসেবার সঙ্গে জড়িত মানুষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বন্যার পর আবারও বৃষ্টি শুরু হওয়ায় পর্যটকের উপস্থিতি কমেছে। বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ধসের মতো দুর্যোগও পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। দেশে তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় এলাকার ক্ষয় এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে পর্যটন অবকাঠামোর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা পরিবেশবিদদের।
পরিবেশবিদ ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অনেক পর্যটন কেন্দ্র ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছে।
অন্যদিকে, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পর্যটন খাতের অবদান বর্তমানে প্রায় ৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা না গেলে এই খাতের প্রবৃদ্ধি আরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, দেশের বিভিন্ন পর্যটন ও ধর্মীয়-প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এ ক্ষেত্রে বড় হুমকি। এই ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ও জরুরি।
প্রকৃতি বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে দিয়েছে বিপুল বৈচিত্র্য। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড়, হাওর কিংবা দ্বীপ—প্রকৃতির নানা রূপের সমাহার রয়েছে দেশে। কিন্তু অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড ও প্রকৃতির ওপর বাড়তে থাকা চাপের কারণে পর্যটন কেন্দ্রগুলো বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।
অস্থিতিশীল আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন সময় পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ছে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলো। বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আগেই পর্যটন অবকাঠামো সুরক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

